Thursday, April 23, 2015

দাঁড়ি রাখার বিধান কি?



দাঁড়ি রাখার বিধান কি?
দাঁড়ি রাখা মর্মে বিভিন্ন আদেশ সূচক
হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আদেশ সূচক বর্ণনা
আসায় অনেক উলামাগণ এটাকে ওয়াজিব
বলেছেন।
যেমন মুহাম্মদ আঃ আল কাফী,‘প্রশ্নোত্তরে
ইসলামী জ্ঞান গ্রহ্নে ’লিখেছেন।
(লিসান্স,মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)।
হারুন বলল, হে আমার মায়ের ছেলে! তুমি
আমার দাঁড়ি ও মাথার চুল ধরো না। (সূরা
ত্বাহা-৯৪)।
অনেক উলামা মত দিয়েছেন, এই
আয়াত,থেকে বোঝা যায় পূর্ববর্তী সমস্ত
নবী রাসূলগণের দাঁড়ি ছিল। অতএব দাঁড়ি
রাখা আবশ্যক বা ফরয।
রাসূল (ছাঃ)বলেন, তোমরা দাঁড়ি রাখ এবং
মুশরিক ও অগ্নি পূজকদের বিরোধীতা কর।
দাঁড়ি লম্বা রাখ, গোফ ছোট কর। (বুখারী
হা/৫৮৯৩, মুসলিম হা/৬২৩, মিশকাত হা/৪৪২১)।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেছেন: তোমরা গোফ
অধিক ছোট করবে এবং দাঁড়ি ছেড়ে দেবে
(বড় রাখবে)। (বুখারী হা/৫৮৯২, তাওহীদ
প্রকাশনী, ইঃ ফা: ৫৩৬১)।
এছাড়াও হাদীসে দাঁড়ি ছেড়ে দেওয়া
বা লম্বা করার বিষয়ে যে শব্দগুলো এসেছে
ﺍﻟِﻠّﺤَﻰ ﻭَﺃَﻋْﻔُﻮﺍ ‘আ‘ওফুল্লুহা’ এর অর্থ হচ্ছে দাঁড়ি
লম্বা করার জন্য ছেড়ে দেওয়া। (ফাতহুল
বারী ১০/৩৫১, হা/৫৮৯৩-এর আলোচনা)।
ﻭﺃﻭﻓﺮﻭﺍ আওফিরু, ﻭَﺃَﻭْﻓُﻮﺍ আওফু, ﻭَﺃَﺭْﺧُﻮﺍ ‘আরখু’ ﻭَﻭَﻑﱢﺭُﻭﺍ
‘ওয়াফিরু’ এই শব্দগুলো সব একই অর্থ বহন করে।
আর তা হলো, দাঁড়ি তার নিজ অবস্থায়
ছেড়ে দেওয়া। (আত-তাহরীক, এপ্রিল-২০১২)।
হাদীসের এ সকল শব্দের অর্থ থেকেই বোঝা
যায়, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাঁড়ি বড় করতে
নির্দেশ করেছেন। নিজ অবস্থায় ছেড়ে
দিতে বলেছেন এবং কাটতে নিষেধ
করেছেন। কিন্তু দাঁড়ি কতটুকু বড় হবে তার
সীমারেখা নির্ধারণ করেননি এবং এ
বিষয়ে উলামারা কোনো ব্যখাও খুজে
পাননি। সাহাবীগণের সকলেরই দাঁড়ি বড়
ছিল। রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী দাঁড়ি যত
বড়ই হোক তা কাটা যাবে না। দাঁড়ি কাঁটা
বা ছাঁটার পক্ষে কোন সহীহ দলীল নেই।
উল্লেখ্য যে, আমর ইবনু শুআইব তার পিতা হতে
তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, নবী
করীম স্বীয় দাঁড়ি প্রস্থ এবং দৈর্ঘ্য হতে
ছেটে নিতেন। (তিরমিযী হা/২৭৬২,
মিশকাত হা/৪৪৩৯)। হাদীসটি জাল।
(আলবানী, সিলসিলাহ যঈফাহ হা/২৮৮)।
বিশ্লেষণঃ তিরমিযী বলেছেন হাদীসটি
গরীব। অতঃপর ইবনু ইসমাঈলের উদ্ধৃতীতে
বলেছেন এটির ভিত্তি নেই। সনদে ‘উমার
ইবনু হারুন ’মুকাবিরুল হাদীস। এ রাবী
সর্ম্পকে যাহাবী ‘‘আল-মীযান”গ্রহ্নে বলেন,
ইবনু মাঈ’ন বলেছেনঃতিনি মিথ্যুক,খবীস।
সালেহ জায়ারা বলেনঃ তিনি মিথ্যুক।
ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে,
ইবনে উমার (রাঃ) যখন হজ্জ বা উমরাহ
করতেন তখন তিনি তাঁর দাঁড়ি মুষ্টি করে
ধরতেন এবং মুষ্টির বাইরে যতটুকু বেশি থাকত
ততটুকু কেঁটে ফেলতেন। (বুখারী হা/৫৮৯৩,
তাওহীদ প্রকাশনী, ই: ফা: ৫৩৬০)।
এই হাদীস (আছার) এর আলোকে অনেক ইমাম
ও আলেম সাহাবাদের এই কর্মকে রাসূল
(ছাঃ)এর সুন্নাতের ব্যাখ্যা হিসাবে
দলীল পেশ করেছেন যে, এক মুষ্টি দাঁড়ির
নিচের অংশটুকু ছেঁটে ফেলা যাবে।
এর নিচে ছাঁটলে বা কাঁটলে তা বিদ’আত
হবে।(বঙ্গানুবাদ বুখারী টীকা, সো: প্র:,
দাঁড়ি বড় রাখা অধ্যায়)।
আর দাঁড়ি কোন সময়কার জন্য চাঁছা বৈধ নয়।
কিন্তু বহু মানুষ আছে যারা কুরবানী করার
সাথে সাথে নিজের দাঁড়িও কুরবানী (?)
করে থাকে! কেউ কেউ সালাতে বের
হওয়ার পূর্বেই দাঁড়ি চেছে সাজ-সজ্জা
করে। অথচ সে এ কাজ করে তিনটি পাপে
আলিপ্ত হয়ঃ (১) দাঁড়ি চাঁছার পাপ, (২) পাপ
কাজের মাধ্যমে ঈদের সৌন্দর্য অর্জন করার
পাপ, (৩) কুরবানীর পশু জবেহ করার পূর্বে চুল
(দাঁড়ি) কাটার পাপ। (সালাতুল ঈদাইন,
আলবানী ৪০ পৃষ্ঠা)।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, দাড়ী
মুন্ডন করা হারাম।
ইমাম কুরতুবী (রঃ) বলেন, দাড়ী মুন্ডান,
উঠানো বা কর্তন করা কোনটাই জায়েয নয়।
শায়খ বিন বায (রঃ) বলেন, দাড়ীকে
সংরক্ষণ করা, পরিপূর্ণ রাখা ও তা ছেড়ে
দেয়া ফরয। এই ফরযের প্রতি অবহেলা করা
জায়েয নয়।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রঃ) বলেন, দাড়ী
রাখা ওয়াজিব,উহা মুন্ডন করা হারাম বা
কাবীরা গুনাহ।
প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের ফিকাহবিদগণও
দাড়ী ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব ও কেটে
ফেলাকে হারাম বলে মত প্রকাশ করেছেন।
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ র্দুরে
মুখতারে (২য় খন্ড/৪৫৯ পৃঃ) বলা হয়েছেঃ
পুরুষের জন্য দাড়ী কর্তন করা হারাম।
ইবনু উমার সুত্রে নবী (ছাঃ)হতে বর্ণিত
তিনি বলেছেন, গোফ কেঁটে ফেলা
ফিতরাত (স্বভাবের) অন্তর্ভূক্ত। (বুখারী
হা/৫৮৯০, তাওহীদ প্রকাশনী, মুসলিম হা/২৫৭,
আহমাদ হা/৭১৪২)।
ইবনে উমার (রাঃ) গোফ এত ছোট করতেন যে,
চামড়ার শুভ্রতা দেখা যেত এবং তিনি
গোফ ও দাড়ির মাঝখানের পশমও কেঁটে
ফেলতেন।
(বুখারী ৫/৪০৪, বঙ্গ:, তাওহীদ প্রকাশনী)।
সর্বশেষ : রাসূল (ছাঃ) হতে সরাসরি গোফ
অধিক ছোট এবং দাঁড়ি বাড়ানো বা
ছেড়ে দেওয়ার আদেশ এসেছে। অধিকাংশ
উলামাগণ এ দলীল পেশ করে মত দিয়েছেন
যে, গোফ ছোট করতে হবে এবং দাঁড়ি
ছেড়ে দিতে হবে, ছাটা বা কাটা যাবে
না। এটাই সঠিক এবং সুন্নাতে নববী।
দাঁড়ি কাটা, ছাটা, চাঁছা কোনটাই শরীয়ত
সম্মত নয়। (আবু দাউদ, নাসাঈ,
তাবারানী,মিশকাত হা/৪৪৫২)।
রাসূল (ছাঃ)এর স্পষ্ট নির্দেশ জানার পর অন্য
কারো মত অনুসরণ করার কোন সুযোগ নেই।
(সূরা আযহাব-৩৩/৩৬)।
ইবনে উমর (রাঃ) এর যখন হজ্ব ও উমরাহ করতেন
তখন এক মুষ্টির অতিরিক্ত দাঁড়ি কেটে
ফেলতেন। এটা তার ব্যক্তিগত আমল এবং হজ্ব
ও উমরাহর সাথে সম্পৃক্ত। রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ)থেকে কোন সময়ই দাঁড়ি খাটো করার
কোন সহীহ দলীল পাওয়া যায় না। অতএব
সবাইকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর অনুসরণ করতে
হবে তা না হলে ক্বিয়ামতের দিন ধরা
পড়ে যেতে হবে। (সূরা ফুরক্বান-২৭ ও ২৮)।
এছাড়া দু একজন সাহাবী থেকে চিবুক
(থুতনী) থেকে ধরে এক মুষ্টি পরিমাণ রেখে
বাকিটুকু ছেটে ফেলার আমল আছে। এটা
তাদের ব্যক্তিগত আমল। বর্তমান আমাদের
সমাজে যে সকল দাঁড়ি চাঁছা, ছাটা দেখা
যায়, তা সবই সুন্নাতের খেলাফ ও
বিজাতীয় রীতি নীতির অনুসরণ। রাসূল
(ছাঃ) এর আদেশ “অগ্নি পূজকদের
বিরোধীতা কর!” বর্তমান সমাজে এ কথার
বিপরীত দেখা যায়।
উল্লেখ্য, ই্সলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে
দাঁড়ি রাখার বিষয়টি অনেকে শাখাগত
বিষয় বলে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ
ভুল। ইসলামের ছোট বড় সকল বিধানই মর্যাদার
দিক দিয়ে সমান। সাহাবায়ে কিরামগণ
সকল বিধানই মর্যাদা দিতেন ও তা পালনের
জন্য জীবনাপাত করতেন। অতএব গুরুত্বের
বিবেচনায় কমবেশি হলেও মর্যাদায় সবই
সমান। আর দাঁড়ি রাখাটা রাসূল এর নির্দেশ
মূলক সুন্নাত এবং পূর্ববর্তী সকল নবী-
রাসূলগণের পালিত সুন্নাত। অতএব এটা
রাসূলুল্লাহ(ছাঃ)এর সুন্নাত অনুযায়ী
রাখতে অন্য কারো অনুকরণে নয়।
দাঁড়িতে খেযাব বা রং লাগানোঃ
রাসূল (ছাঃ)বলেন, শেষ যামানায় এক
শ্রেণীর লোক চুল দাঁড়িতে কাল রং দ্বারা
খেযাব দেবে। দেখতে কবুতরের বুকের মত
সুন্দর লাগবে। তারা জান্নাতের সুগন্ধিও
পাবে না। (আবু দাউদ হা/৪২১২, সনদ সহীহ)।
‘তোমরা সাদা চুলকে পরিবর্তন কর, তবে
কালো রং থেকে বিরত থাক(মুসলিম
হা/২১০২)।
আবূ উমামা(রাঃ)হতে বর্ণিত,রাসূল(ছা
ঃ)কিছু আনছার ছাহাবীর সাদা দাঁড়ি চুল
গুলো লাল অথবা হলুদ রং দ্বারা পরিবর্তন কর
এবং আহলে কিতাবদের বিরোধিতা কর।
(আহমাদ হা/২২৩৩৭;সিলসিল ছহীহাহ
হা/১২৪৫)।
এসকল হাদীসে বোঝা যায় যে, চুল বা
দাঁড়িতে কালো রং করা যাবে না।
তবে অন্য যে কোন রং করা যাবে মেহেদী
লাগানো যাবে।
(তিরমিযী আবু দাউদ, মিশকাত হা/৪৪৫১)।

No comments:

Post a Comment