
রমজানের শেষ দশদিন বেশি ইবাদত করা প্রসঙ্গে।
********************************************
রমজানের শেষ দশ দিনকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে নাজাতের মৌসুম বানিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যান্য দিনের চেয়ে এ দশ দিন খুব বেশি ইবাদত করতেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত,
'যখন রমজানের শেষ দশ দিন প্রবেশ করত, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে জাগ্রত থাকতেন। পরিবারের লোকজন জাগিয়ে দিতেন এবং নিজে কোমর বেঁধে ইবাদতে মনোনিবেশন করতেন।' (মুসলিম : ১১৭৪)
তিনি অন্যত্র বলেন,
'রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে এতো মেহনত করতেন, যা তিনি অন্যান্য সময় করতেন না।' (মুসলিম : ১১৭৫)
বুখারি এবং মুসলিমের অভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে,
রমজানের শেষ দশদিনে রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। নিজে জাগতেন এবং পরিবারের লোকজনকেও জাগিয়ে তুলতেন। (বুখারি : ২০২৪, মুসলিম : ১১৭৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইবাদত ছিল কুরআন তিলাওয়াত, সালাত, জিকির ও সদকা ইত্যাদি। এসব আমলের জন্য আল্লাহর রাসূল অবসর নিয়ে নিতেন। আমাদেরও উচিত এসব দিনগুলোতে বেশি বেশি আমল করা এবং দুনিয়াবি আমল থেকে যথাসম্ভব অবসর নিয়ে নেয়া বা দুনিয়াবি আমল কম করে ফেলা।
এ দশ দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যে হচ্ছে, রাতে জাগ্রত থাকার জন্য চেষ্টা করা, দীর্ঘ কিয়াম, রুকু, সেজদা ও কিরাতের মাধ্যমে সালাত আদায় করা। পরিবার ও সন্তানদের জাগিয়ে দেয়া, যাতে তারাও মুসলমানদের সঙ্গে এসব ইবাদতে অংশ গ্রহণ করতে পারে এবং ইবাদতের মাধ্যমে তারা বেড়ে উঠে। বর্তমান যুগে অনেক অভিভাবকই এ থেকে অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। তারা তাদের সন্তানদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে, বেহুদা আড্ডায় রাত জাগতে অভ্যস্ত করে তুলেছে। তারা এসব রাতকে সম্মান করে না। তাদের অন্তরে এসব রাতের কোন গুরুত্ব নেই। এটা কোন ক্রমেই সুস্থ্ তরবিয়ত বা সঠিকভাবে সন্তানদের গড়ে তোলা নয়। এটা বড় ধরনের দুর্ভাগ্য যে, এ রাতগুলো আসবে আর চলে যাবে, অথচ তাদের সন্তানরা এর থেকে কোন উপকার হাসেল করবে না। আবার কেউ কেউ বলে থাকে যে, এগুলো হচ্ছে নফল ইবাদত। আমাদের শুধু ফরজ আদায় করলেই যথেষ্ট হবে। আয়েশা রা. তাদের ব্যপারে বলেছেন, 'আমি এমন কতক লোকদের সম্পর্কে শুনতে পেয়েছি, যারা বলে, আমরা শুধু ফরজ আদায় করতে পারলেই চলে। অতিরিক্ত আমল করার ব্যাপারে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ কথা ঠিক যে, আল্লাহ ফরজ ছাড়া অন্য কোন ইবাদতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন না, কিন্তু তারা রাত দিন ভুল করছে। তোমাদের নবী তোমাদের মত একজন বান্দা ছিলেন, তোমরাও তোমাদের নবীর মত আল্লাহর বান্দা। কিন্তু তোমাদের নবী কখনো এ রাতগুলো জাগ্রত করা ত্যাগ করেননি।
এ রাতগুলোর আরো একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, লাইলাতুল কদরের উপস্থিতি। যে রাতের ব্যাপারের আল্লাহ তাআলা বলেন,
{ليلة القدر خير من ألف شهر} [القدر 3]
'লাইলাতুল কদর হাজার মাস থেকে উত্তম।' (সূরা কদর : ৩)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
'যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের নিয়তে লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থাকবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।' (বুখারি : ১৯০১, মুসলিম : ৭৬০)
শেষ দশ রাতের সবকটি রাতে জাগ্রত থাকা ব্যতীত এ রাত পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ কোন রাতে এর উপস্থিতি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এখানেও রয়েছে বান্দার ওপর আল্লাহর রহমত। বান্দাগণ লাইলাতুল কদরের অন্বেষণে এ দশ রাতের সবক'টিতেই বেশি বেশি ইবাদত করবে, তাদের সওয়াব বৃদ্ধি পাবে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা এ রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদত করো। এ রাতগুলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মোক্ষম সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি রমজান সম্পর্কে বলেছেন, 'এ মাসের শুরু অংশ হচ্ছে রহমত, মধ্যম অংশ হচ্ছে মাগফেরাত আর তৃতীয় অংশ হচ্ছে জাহান্নাম থেকে মুক্তির।' মুসলমানদের যে কেউ এ রহমত, মাগফেরাত ও মুক্তির মাস পেয়ে ইবাদতের জন্য চেষ্টা করে, তার সময়ের হিফাজত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্য যথাসাধ্য যত্নবান থাকে সে এ মাসের সব ধরণের বরকত ও ফজিলত প্রাপ্ত হবে বলে আমরা দৃঢ় আশাবাদি। ফলে পরবর্তীতেও জান্নাতে উচ্চ মাকাম লাভে ধন্য হবে। ইনশাআল্লাহ।
অনেক ইমাম ও মুসল্লিদের দেখা যায়, রমজানের শুরু রাতে খুব ইবাদত করেন কিন্তু শেষ রাতে কিছুই করেন না। আবার কেউ কেউ রমজানের শেষ রাতে খুব ইবাদত করেন, কিন্তু শুরু রাতে কোন এবাদতই করেন না। এটা কখনো উচিত নয়। বরং শুরুতেও ইবাদত করা উচিত এবং শেষ রাতেও ইবাদত করা উচিত। তবেই এ রাতগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন হবে। ইনশাআল্লাহ।
--------------------------------------------
No comments:
Post a Comment