Tuesday, May 26, 2015

প্রশ্ন (২১): তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন নামক তাফসীরটি কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে প্রণীত কি? -




দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
===============
প্রশ্ন (২১): তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন নামক তাফসীরটি কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে প্রণীত কি?
-
উত্তর: এ তাফসীরে কিছু ভ্রান্ত আক্বীদা ও আমল এবং বহু স্থানে ভুল তাফসীরের সমাবেশ ঘটেছে। ফলে একে বিশুদ্ধ তাফসীর বলা যায় না। এর মধ্যে উল্লেখিত ভুলগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হ’ল : (১) ‘নবী’ বা ‘ওলী’র বরাত দিয়েও আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য প্রার্থনা করা কুরআনের নির্দেশ ও হাদীছের বর্ণনায় বৈধ প্রমাণিত হয়েছে’ (পৃঃ ৯, ৩২৭)। অথচ মৃত নবী বা অন্য কারুর অসীলা দিয়ে প্রার্থনা করা স্পষ্ট শিরক (মুসলিম হা/২০৪; মিশকাত হা/৫৩৭৩) (২) ‘সৃষ্ট জগতের মাঝে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নূর সৃষ্টি করা হয়েছে’... এক হাদীছে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন’ (পৃঃ ৪২৮)। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল আক্বীদা এবং হাদীছটি জাল (ছহীহাহ হা/৪৫৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)। (৩) ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর পবিত্র রওজা শরীফে জীবিত আছেন।... এ কারণই তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টন করা হয়নি এবং এর ভিত্তিতেই তাঁর পত্নীগণের অবস্থা অপরাপর বিধবা নারীদের মত হয়নি’ (পৃঃ ১০৯৩)। অথচ ‘হায়াতুন্নবী’-র এই আক্বীদা পরিষ্কার শিরকী আক্বীদা (যুমার ৩০) (৪) ‘কোন না কোন একজন মুজতাহিদ ইমামের তাক্বলীদ করা অপরিহার্য। সকল মুজতাহিদ ইমামই সত্য’ (পৃঃ ৭৪৩)। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণই কেবল অপরিহার্য এবং মুজতাহিদ ইমামগণ ভুলের ঊর্ধ্বে নন (৫) ‘আল্লাহ তা‘আলার কোন আকার নেই’ (পৃঃ ১৪৬৫)। অথচ কুরতুবী স্বীয় তাফসীরে অন্যের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এভাবে যে, ‘আমরা মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি’। এর অর্থ অনেকে করেছেন علي صورة الرحمن ‘আল্লাহর আকৃতিতে’। অথচ আল্লাহর বাস্তব আকার (صورة مةشخصة) কোথায় আছে ভাবার্থ ব্যতীত? (ঐ, ২০/১১৪)’। এ বিষয়ে সঠিক আক্বীদা হ’ল এই যে, আললাহর আকার আছে। কিন্তু তার তুলনীয় কিছুই নেই (শূরা ১১)। (৬) ‘এলমে তাছাউফও ফরযে আইনের অন্তর্ভুক্ত’ (পৃঃ ৫৯৬)। অথচ দ্বীনী ইলম হাছিল করা ফরয। ইসলামের সকল ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হ’ল তাযকিয়ায়ে নাফ্স বা আত্মশুদ্ধি। পৃথকভাবে ইলমে তাছাউওফের কোন অস্তিত্ব শরী‘আতে নেই। বরং কথিত ছুফীবাদের চোরাগলি দিয়েই মুলমানদের মধ্যে অধিকাংশ শিরক প্রবেশ করেছে (৭) অনুরূপভাবে সূরায়ে ‘মুহাম্মাদ’ ৩৮ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম সৈয়ূতীর বরাতে বলা হয়েছে যে, ‘আলোচ্য আয়াতে ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর সহচরদেরকে বুঝানো হয়েছে। কেননা তাঁরা পারস্য সন্তান। কোন দলই জ্ঞানের সেই স্তরে পৌঁছেনি, যেখানে আবু হানীফা ও তাঁর সহচরগণ পৌঁছেছেন’ (পৃঃ ১২৬৩)। এমনিভাবে অসংখ্য শিরকী আক্বীদা ও বিদ‘আতী আমলের প্রচারণা চালানো হয়েছে অত্র তাফসীর গ্রন্থে। অতএব কেউ পড়তে চাইলে জ্ঞান-বিবেক জাগ্রত রেখেই এ তাফসীর পড়তে হবে। কেননা তার মধ্যে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় ও রয়েছে।
=
প্রশ্ন (২২): মাওলানা ইলিয়াস ছাহেব লিখিত মালফূযাত গ্রন্থের ২৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, ‘যাকাতের দরজা হাদিয়ার নিম্নে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর ছাদাক্বা হারাম ছিল, হাদিয়া হারাম ছিল না।’ এর সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।
-
উত্তর: উল্লিখিত মন্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ ইসলামী শরী‘আতে যাকাত ‘ফরয’। যে পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম হচ্ছে যাকাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ছালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর ও রাসূলের আনুগত্য কর। অবশ্যই তোমরা রহমত প্রাপ্ত হবে’ (নূর ২৪/৫৬)। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে ছালাতের পরেই যাকাতের নির্দেশ এসেছে। ছহীহ হাদীছে যাকাতকে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ বলা হয়েছে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য হাদিয়ার কথা বলেছেন মাত্র। পারস্পরিক ‘হাদিয়া’ প্রদান করা সুন্নাত। কাজেই যাকাতের ‘ফরয’ দরজা হাদিয়ার নিম্নে উল্লেখ করা নিতান্ত অন্যায়। দ্বিতীয়তঃ যাকাত হ’ল ছাদাক্বা বা ফরয অনুদান। যা গ্রহণ করা বিশ্বনবী হিসাবে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর পরিবারের জন্য মর্যাদাকর নয়। পক্ষান্তরে ‘হাদিয়া’ হ’ল উপঢৌকন। এতে মর্যাদা হানিকর কিছু নেই। সম্ভবতঃ সেকারণে রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য ‘হাদিয়া’ হারাম করা হয়নি।
=
প্রশ্ন (২৩): ছালাত শেষে সালাম ফিরানোর সময় যে দু’বার সালাম দেওয়া হয় তা কাকে দেওয়া হয়?
-
উত্তর: রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ছালাত আদায়কারী তার ডানে এবং বামে থাকা ভাইদেরকে সালাম প্রদান করবে (মুসলিম হা/৪৩১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪০১৯)। অতএব সালাম ফিরানোর সময় ডানে এবং বামে থাকা ভাইদেরকে সালাম প্রদানের নিয়ত করবে। আর যদি একাকী ছালাত আদায় করে, তাহ’লে ডানে ও বামে থাকা ফেরেশতাদের সালাম প্রদানের নিয়ত করবে (ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ ৩/৪৫৬, ৪৬২; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৩২৬, ৩২৭; শায়খ ওছাইমীন, শারহুল মুমতে‘ ৩/২০৮)। সর্বোপরি রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুসরণে এটা করা হয়। যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব।
=
প্রশ্ন (২৪): প্রস্রাব শেষে দু’এক কদম হাঁটার পর সবসময়ই দু’এক ফোঁটা প্রস্রাব নির্গত হ’তে দেখা যায়। এক্ষণে টয়লেটের মধ্যেই টিস্যু নিয়ে দু’এক কদম হাঁটায় কোন বাধা আছে কি?
-
উত্তর: এটা এক প্রকার রোগ। এর জন্য চিকিৎসা নিতে হবে। এক্ষত্রে সর্বশেষ ফোঁটা বের হয়ে আসা পর্যন্ত বসে থেকে পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর উঠবে। আর পানি না থাকলে ঢিলা অথবা টিস্যু ব্যবহার করবে (তিরমিযী হা/১৬, ইবনু মাজাহ হা/৩১৬, সনদ ছহীহ)। এরপরেও দু’এক ফোঁট নির্গত হ’তে দেখলে টয়লেটের ভিতরে থেকে প্রস্রাব হ’তে পবিত্র হওয়ার জন্য যে কোন উপায় গ্রহণ করা যেতে পারে।
=
প্রশ্ন (২৫): সূরা ফাতিহার ‘ওয়ালাযযাল্লীন’ পাঠে ক্বারীগণের মতভেদ রয়েছে। এক্ষণে এরূপ উচ্চারণগত মতপার্থক্যের কারণে ছালাত বিনষ্ট বা গুনাহ হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কি?
-
উত্তর: বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠকারী ক্বারীদের মাঝে ‘ওয়ালাযযাল্লীন’ পাঠের ক্ষেত্রে কোন মতভেদ নেই। প্রতিটি আরবী অক্ষরের মাখরাজ বা নির্দিষ্ট উচ্চারণস্থল রয়েছে। আরবী অক্ষর মাখরাজ অনুযায়ী উচ্চারণ করতে হবে। ‘যোয়াদ’-কে অন্য অক্ষরের ন্যায় উচ্চারণ করা হ’লে অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে। ফলে ছালাত বাতিল না হ’লেও ত্রুটিপূর্ণ হবে। অতএব আরবী হরফের মাখরাজ অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করে পড়া যরূরী। তবে ভুলক্রমে বা চেষ্টা করা সত্ত্বেও উচ্চারণ করতে না পারলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
=
প্রশ্ন (২৬): জামা‘আতবদ্ধ ছালাতে ইমাম অধিকহারে ভুল করলে মুক্তাদীদের করণীয় কি? এরূপ ছালাত পুনরায় আদায় করতে হবে কি?
-
উত্তর: ছালাতে ইমাম ভুল করলে মুক্তাদীদের কর্তব্য হ’ল লোকমা দিয়ে ভুলটি শুধরিয়ে দেওয়া (আবুদাঊদ হা/৯০৭, সনদ হাসান)। আর শুধরানো সম্ভব না হ’লে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ছালাত বাতিল হবে না। আর ইমাম উদাসীনতার কারণে বার বার ভুল করলে এর গুনাহ তার উপরে বর্তাবে, মুক্তাদীর উপরে নয়। ছালাতে ভুলক্রমে কোন ‘ওয়াজিব’ তরক হয়ে গেলে শেষ বৈঠকের তাশাহ্হুদ শেষে সালাম ফিরানোর পূর্বে ‘সিজদায়ে সহো’ দিতে হয়। শাওকানী বলেন, ওয়াজিব তরক হ’লে ‘সিজদায়ে সহো’ ওয়াজিব হবে এবং সুন্নাত তরক হ’লে ‘সিজদায়ে সহো’ সুন্নাত হবে (আস-সায়লুল জাররা-র ১/২৭৪ পৃঃ)। কিন্তু ছালাতে ক্বিরাআত ভুল হ’লে বা সের্রী ছালাতে ভুলবশত ক্বিরাআত জোরে বা তার বিপরীত হয়ে গেলে সহো সিজদার প্রয়োজন নেই।
স্মর্তব্য যে, ছালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্য (মা‘আরিজ ৭০/৩৪)। আর ছালাতে উদাসীনদের জন্য রয়েছে ‘দুর্ভোগ’ (মাউন ১০৭/৫)। অতএব ইমামদের কর্তব্য হ’ল পূর্ণ সচেতনতার সাথে ইমামতির দায়িত্ব পালন করা।
=
প্রশ্ন (২৭): তাশাহহুদে বসা অবস্থায় দৃষ্টি সিজদার স্থানের দিকে না আঙ্গুল নাড়ানোর দিকে রাখতে হবে?
-
উত্তর : তাশাহহুদে বসা অবস্থায় দৃষ্টি রাখতে হবে আঙ্গুলের ইশারার দিকে। রাসূল (ছাঃ) যখন তাশাহহুদে বসতেন, তখন ...তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন এবং তাঁর দৃষ্টি আঙ্গুলের ইশারা বরাবর থাকত তার বাইরে যেত না। (আবুদাউদ হা/৯৮৮, ৯৯০; নাসাঈ হা/১২৭৫; মিশকাত হা/৯১২)। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, তাশাহহুদের সময় দৃষ্টি আঙ্গুলের উপর রাখাই সুন্নাত (নববী, শারহ মুসলিম হা/৯১০, নায়লুল আওতার ২/৩১৭)।
=
প্রশ্ন (২৮): মসজিদে মুরগী, টাকা-পয়সা ইত্যাদি মানতকৃত বস্ত্ত জমা হ’লে এর হকদার ইমাম ছাহেব হবেন কি?
-
উত্তর: মানতকৃত বস্ত্ত মানতকারীর নিয়ত অনুযায়ী ব্যয় করতে হবে। এতে ইমাম ছাহেবের হক থাকার প্রশ্নই আসে না।
=
প্রশ্ন (২৯): আমি পেনশন হিসাবে যে অর্থ পেয়েছি তা দ্বারা আমার জন্য হজ্জের ফরযিয়াত আদায় করা যরূরী না স্ত্রী-সন্তানদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ করা যরূরী হবে? সঠিক সিদ্ধান্ত জানতে চাই।
-
উত্তর: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এগুলি মানুষের মৌলিক চাহিদা। এক্ষণে যদি পরিবারের জন্য থাকার উপযোগী নিজস্ব কোন বাসস্থান না থাকে, তাহ’লে প্রথমে বাসস্থান নির্মাণ করবে। অতঃপর সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করল, আমরা কি দরিদ্র মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত নই? আব্দুল্লাহ (রাঃ) তাকে বললেন, তোমার কি স্ত্রী আছে, যেখানে তুমি শান্তি পেতে পার? লোকটি বলল, হ্যাঁ। তোমার বাসস্থান আছে কি যেখানে তুমি আশ্রয় নিতে পার? লোকটি বলল, জি হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহ’লে তুমি ধনী (মুসলিম হা/২৯৭৯, মিশকাত হা/৫২৫৭)।
=
প্রশ্ন (৩০): জনৈক ধার্মিক ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে পরবর্তীতে মারা গেছেন। তার মেয়েরাও ধার্মিক। এক্ষণে তার কোন মেয়েকে বিবাহ করা জায়েয হবে কি?
-
উত্তর: এরূপ মেয়েদের বিবাহ করায় কোন দোষ নেই। বরং ধার্মিক মনে করলে তাদেরকেই বিবাহ করতে হবে (তিরমিযী, মিশকাত হা/৩০৯০)। অবৈধ সম্পদ উপার্জনের জন্য পিতা দায়ী হবেন, সন্তানরা নয় (আন‘আম ৬/১৬৪)।
=
প্রশ্ন (৩১): আমার ছোট বোন জনৈক লম্পট ছেলেকে পিতার সম্মতি ছাড়াই বিবাহ করে বাড়ি ছেড়েছে। এক্ষণে আমাদের করণীয় কি? তার দৈনিক খরচ নির্বাহের জন্য প্রদত্ত অর্থ এবং পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে কি? অথচ তা প্রদান করলেও উক্ত লম্পট ছেলেটি তা হারাম কাজে ব্যবহার করবে। এক্ষণে আমাদের করণীয় কি?
-
উত্তর: ধর্মত্যাগ ও হত্যাকারী ব্যতীত সন্তানকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার কোন বিধান শরী‘আতে নেই (বুখারী, মুসলিম, আবুদাঊদ মিশকাত হা/৩০৪৩, ৩৫০০)। পিতা-মাতা একাজ করলে সন্তানের হক নষ্ট করা হবে, যা পরকালে নিজের নেকী থেকে তাকে পরিশোধ করতে হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৫১২৭)। এক্ষণে পিতার জন্য করণীয় হ’ল, দ্রুত সমাঝোতা করে নতুনভাবে বিবাহের ব্যবস্থা করা অথবা মেয়েকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনা। কারণ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত নারীদের বিবাহ জায়েয নয় (তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১৩১)। অথবা মেয়ে স্বামীর সাথে ‘খোলা’ করে ফিরে আসবে। কারণ এভাবে একত্রে অবস্থান করা যেনার শামিল।
=
প্রশ্ন (৩২): রাসূল (ছাঃ) ঋতুবতীদের ঈদের ছালাতে অংশগ্রহণ না করে দো‘আয় শরীক হ’তে বলেছেন। এটা দ্বারা কি উক্ত ছালাতে সম্মিলিত মুনাজাত প্রমাণ হয় না?
-
উত্তর: এখানে দো‘আয় শরীক হওয়ার অর্থ হ’ল, খুৎবা শ্রবণ করা, তা থেকে নছীহত গ্রহণ করা, উক্ত সমাগমে শরীক হয়ে তাকবীর, তাহলীল, তাহমীদ ও তাসবীহে অংশগ্রহণ করা ইত্যাদি। সেকারণ ঊক্ত হাদীছের বর্ণনাকারী উম্মু আতিয়া (রাঃ) বলেন, আমাদের পর্দানশীন কুমারী হায়েযা মহিলারা ঈদের ময়দানে বের হ’তেন। অতঃপর লোকদের পিছনে অবস্থান করে তাদের সাথে তাকবীরে অংশগ্রহণ করতেন (মুসলিম হা/৮৯০; ছহীহাহ হা/৬০০)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘অতঃপর মহিলারা পুরুষদের পিছনে থাকত, তারপর তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর ও তাদের দো‘আর সাথে দো‘আ করত এবং এই দিনের বরকত ও পবিত্রতার প্রত্যাশা করত’ (বুখারী হা/৯৭১)। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় মিশকাতের ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন, ‘মুসলিমদের দো‘আ বলতে সকলকে শামিল করে। উক্ত কথা দ্বারা ঈদের ছালাতের পরে দো‘আ করা বুঝানো হয়, যেমনটি পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের শেষে করা হয়। অথচ তা ত্রুটিপূর্ণ। কারণ ঈদায়েনের ছালাতের পর দো‘আ করা রাসূল (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত নয়। আর কেউ তা বর্ণনাও করেনি। বরং তাঁর থেকে প্রমাণিত আছে যে, ছালাতের পরে খুৎবা ছাড়া দ্বিতীয় কোন কাজ করতেন না। সুতরাং ‘দা‘ওয়াতুল মুসলিমীন’ দ্বারা উক্ত অর্থ গ্রহণ করা ঠিক হবে। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হ’ল- যিকির-আযকার-দো‘আ, বক্তব্য-নছীহত। কারণ দাওয়াত শব্দটি ব্যাপক’ (মির‘আতুল মাফাতীহ ৫/৩১)।
=
প্রশ্ন (৩৩): নবী করীম (ছাঃ)-এর দেহে খাতমে নবুঅতের চিহ্ন কোথায় ছিল এবং তা কেমন ছিল? কোন কোন ছাহাবী তা চুমু দিয়েছিলেন বলে যা প্রচলিত রয়েছে। এর সত্যতা আছে কি?
-
উত্তর: নবী করীম (ছাঃ)-এর খাতমে নবুঅতের চিহ্ন তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যস্থলে ছিল। আর তা ছিল কবুতরের ডিমের মত (মুসলিম হা/২৩৪৪; তিরমিযী হা/৩৬৪৪; মিশকাত হা/৫৭৭৯; ছহীহাহ হা/৩০০৫)। ছাহাবী সালমান ফারেসী (রাঃ) সেটা দেখেই তাকে আখেরী নবী ও সত্যনবী হিসাবে চিনেছিলেন এবং তাতে চুমু খেয়েছিলেন (আহমাদ হা/২৩৭৮৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৯৪)।
=
প্রশ্ন (৩৪): ক্বিয়ামতের দিন জিন জাতি কি মানুষের মতই বিচারের সম্মুখীন হবে? তাদের নবী কে?
-
উত্তর: মানবজাতির ন্যায় জিন জাতিকে বিচারের সম্মুখীন করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানব জাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি জিন ও মানুষ দিয়ে জাহান্নামকে পূর্ণ করব’ (সাজদাহ ৩২/১৩)। তিনি আরো বলেন, ‘হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে পয়গম্বরগণ আগমন করেননি, যাঁরা তোমাদেরকে আমার বিধানসমূহ বর্ণনা করতেন এবং তোমাদেরকে আজকের এ দিনে সাক্ষাতের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করতেন? (আন‘আম ৬/১৩০)। উল্লি­খিত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জিন জাতি বিচারের সম্মুখীন হবে, তারা জান্নাতী বা জাহান্নামী হবে। সূরা আহক্বাফের ৩১ আয়াতের আলোকে ইবনু কাছীর (রহঃ) একথাকেই প্রধান্য দিয়েছেন (ইবনু কাছীর আহক্বাফ ৩১ আয়াতের তাফসীর দ্রঃ)। আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) মানব ও জিন সহ সমস্ত সৃষ্টির নিকটে নবী হিসাবে প্রেরিত হয়েছেন (মুসলিম হা/৫২৩; তিরমিযী হা/১৫৫৩; মিশকাত হা/৫৭৪৮)। এছাড়া অন্যান্য নবীগণের সময়ে জিনেরা তাঁদের অনুসারী উম্মত ছিল।
=
প্রশ্ন (৩৫): ‘আত-তাহরীক’ শব্দের অর্থ কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
-
উত্তর: ‘তাহরীক’ (تحريك) অর্থ আন্দোলন। ‘আত-তাহরীক’ অর্থ বিশেষ আন্দোলন। ইংরেজীতে যাকে বলা যাবে The Movement অথবা That very Movement। অতএব ‘আত-তাহরীক’ বিশেষ একটি আন্দোলনের লক্ষ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। সে আন্দোলন পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক জীবন গড়ার আন্দোলন। সে আন্দোলন আললাহ প্রেরিত সর্বশেষ অহি ভিত্তিক সমাজ গড়ার আন্দোলন। সে আন্দোলন বিশ্ব মানবতার প্রকৃত মুক্তি আন্দোলন। যে মানুষ নিজের জ্ঞানকে অহি-র জ্ঞানের সামনে বিনা দ্বিধায় সমর্পণ করে দিবে, যে মানুষ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নির্দেশকে সানন্দে মাথা পেতে মেনে নিবে, দুনিয়ার চাইতে আখেরাতকে সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিবে ‘আত-তাহরীক’ ইনশাআল্লাহ তাদেরই মুখপত্র।
-
প্রশ্ন (৩৬): জানাযার ছালাতের সময় লাশ সামনে রেখে মৃতের ঋণ ও অছিয়ত ছাড়াও একজন পরিচালকের মাধ্যম সমাজের বিশিষ্টজন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়। এরূপ কর্মকান্ড শরী‘আতসম্মত কি?
-
উত্তর: এরূপ করা শরী‘আতসম্মত নয়। রাসূল (ছাঃ) এবং ছাহাবায়ে কেরাম থেকে এ ব্যাপারে কোন আমল পাওয়া যায় না। যিনি ইমামতি করবেন, তিনি উপস্থিত জনসাধরণের উদ্দেশ্যে ঈমান বর্ধক সংক্ষিপ্তভাবে কিছু নছীহত করতে পারবেন। যাতে উপস্থিতগণ নিজেদেরকে মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্তত করতে পারেন (বুখারী হা/৪৯৪৯; আবুদাউদ হা/৪৭৫৩; মিশকাত হা/১৬৩০)।
=
প্রশ্ন (৩৭): মাসবূক ব্যক্তি ইমাম হ’তে পারবে কি?
-
উত্তর: মসজিদে প্রবেশ করে যদি কেউ দেখেন যে, মুছল্লীগণ ছালাত আদায় করে নিয়েছেন ও মাসবূক তার বাকী ছালাত আদায় করছেন। এমতাবস্থায় তিনি জামা‘আতের নেকীর আশায় মাসবূককে ইমাম করতে পারেন মর্মে বহু বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন। তবে এ ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম থেকে কোন আমল পাওয়া যায় না।
শায়খ ওছায়মীন (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে বিদ্বানগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, এটি ছহীহ নয়। কেউ বলেছেন, এটা ছহীহ। তবে উত্তমের বিরোধী’। (তিনি বলেন,) এটি ছহীহ হ’লেও সুন্নাতের চাইতে বিদ‘আতের অধিক নিকটবর্তী। কেননা ছাহাবায়ে কেরাম এমনটি করেননি। কোন ব্যক্তির যখন জামা‘আতের কিছু অংশ ছুটে যায়, তখন তিনি বাকীটা একাকী দাঁড়িয়ে আদায় করেন। অতঃপর যদি মাসবূকের ইমামতি ছহীহ ধরা হয়, তাহ’লে এটাতে ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হ’তে পারে। ফলে পরে যিনি প্রবেশ করবেন তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তির, তারপর যিনি প্রবেশ করবেন তিনি তৃতীয় ব্যক্তির, অতঃপর চতুর্থ ব্যক্তির, এভাবে জামা‘আত চলতেই থাকবে... (ওছায়মীন, মুহাযারাতুল মাক্বরূআহ, লিকাউল বাবিল মাফতূহ-১২)।
=
প্রশ্ন (৩৮): সূদ গ্রহণ না করে কেবল হেফাযতের উদ্দেশ্যে ব্যাংকে টাকা রাখা যাবে কি?
-
উত্তর: নিরুপায় অবস্থায় হেফাযতের উদ্দেশ্য ব্যাংকে টাকা রাখা যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আল্লাহ যা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, তা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। তবে তোমরা নিরূপায় হয়ে পড়লে তা স্বতন্ত্র কথা... (আন‘আম ১১৯)। তবে অন্য কোন নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে না রাখাই কর্তব্য। কেননা এরূপ রাখার মাধ্যমে পাপের সহযোগিতা করা হয়। আর আল্লাহ পাপের সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন (মায়েদাহ ৫/২)।
=
প্রশ্ন (৩৯): আদম (আঃ) আরশের পায়ায় লেখা কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ দেখে বলেন, আল্লাহ তুমি আমাকে ‘মুহাম্মাদ’ নামের অসীলায় মাফ করে দাও, তখন আল্লাহ তাকে মাফ করেন। একথার কোন সত্যতা আছে কি?
-
উত্তর: উক্ত মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ‘মওযূ‘ বা জাল (আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/২৫; হাকেম হা/৪২২, তাহকীক যাহাবী, সনদ জাল)।
=
প্রশ্ন (৪০): রাসূল (ছাঃ)-কে তাঁর চাচা আবু ত্বালেব যে দুশমনদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এর বিনিময়ে কি তিনি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন? তার অবস্থা কি হবে?
-
উত্তর: জান্নাতবাসী হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক না করা। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচা আবু ত্বালেব এর মৃত্যু মুশরিক অবস্থায় হয়েছিল। তবে রাসূল (ছাঃ)-এর কারণে জাহান্নামীদের মধ্যে তার শাস্তি সর্বাপেক্ষা সহজতর হবে। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘জাহান্নামীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহজতর শাস্তি হবে আবু ত্বালেবের। তাঁর দু’পায়ে দু’খানা আগুনের জুতা পরানো হবে। এতে তার মাথার মগজ ফুটতে থাকবে’ (বুখারী হা/৬৫৬২, মুসলিম হা/২১২, মিশকাত হা/৫৬৬৮)। তিনি বলেন, যদি আমি না হ’তাম (অর্থাৎ শাফা‘আত না থাকত), তাহ’লে তিনি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকতেন। অতঃপর আমি তাকে নিম্নস্তর থেকে টাখনু পর্যন্ত উঠিয়ে আনি’ (মুসলিম হা/২০৯)। নিঃসন্দেহে এটি ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা (আলোচনা দ্রঃ সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫৫)


No comments:

Post a Comment