Monday, June 1, 2015

ইসলাম ঋণ গ্রহণকে সীমিত আকারে বৈধতা দিয়েছে।




ইসলামে ঋণ গ্রহণ বৈধ। নবী করিম (সা.)
উপবাস থাকলেও দুনিয়াবি কারণে ঋণ
করেননি। তবে ইসলামের কাজে ধার-
কর্জ করেছেন বলে হাদিসে পাওয়া যায়।
হজরত আবু রাফে (রা.) থেকে বর্ণিত,
'রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কাছ
থেকে একটি উট ধার নেন। অতঃপর
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে উটটি এলে
আবু রাফেকে আদেশ দেয়া হয় যেন সেই
ব্যক্তির উট ফেরত দেন।' (মুসলিম : ৫-৫৪)।
ইসলাম ঋণ গ্রহণকে সীমিত আকারে
বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনে-
অপ্রয়োজনে ঋণ করে আভিজাত্য
প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা আজ আমাদের
নিত্যদিনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।
বিলাসিতার জন্য ঋণ করা কিছুতেই
ইসলামসম্মত নয়।
হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
'কারও ঘরে একটি বিছানা তার জন্য,
অপরটি তার স্ত্রীর জন্য, তৃতীয়টি
মেহমানদের জন্য এবং চতুর্থটি শয়তানের
জন্য।' (মুসলিম)।
বিপদে-আপদে বিভিন্ন প্রয়োজনে কারও
কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি দিলেও
তা পরিশোধের নির্দেশও দিয়েছেন
কঠোরভাবে।
কিন্তু অনেকে পরিশোধ না করার ইচ্ছা নিয়েই ঋণ করেন। 'ভবিষ্যতে একান্তই দিতে হলে দিয়ে দেব; আর না দিয়ে পারলে তো বাঁচা গেল' এই তাদের মনোবৃত্তি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
'যে ব্যক্তি পরিশোধ করার নিয়তে
মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে আল্লাহ তাকে
পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেন। আর
যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ ধ্বংস করার
জন্য গ্রহণ করে আল্লাহ তায়ালা তাকে
ধ্বংস করবেন।' (বোখারি : ২/৮৪১)।
এক ধরনের ঋণখেলাপি ব্যক্তি আছেন,
যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারকে ঠকানোর মনোবৃত্তি নিয়েই ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেন। ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করে এ টাকায় ব্যবসা- বাণিজ্যের মাধ্যমে আরও বেশি করে উপার্জন করার হীন মানসিকতা থাকে
তাদের অন্তরে। থাকে অন্যের টাকায়
বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। কোনো কৌশল
অবলম্বন করে হয়তো আপনি দুনিয়ার
আদালত থেকে রেহাই পেতে পারবেন;
কিন্তু এর মাধ্যমে আপনি নিজেকেই
ঠকাচ্ছেন। পরকালে আপনার নেক আমল
দিয়ে তা পরিশোধ করতে হবে।
ঋণখেলাপিরা কেয়ামতের দিন নিজের
সারা জীবনের আমল দিয়েও হয়তো
রেহাই পাবেন না ঋণের বোঝা থেকে।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির যদি কোনো নেক
আমল থাকে তাহলে আল্লাহ তায়ালা
সেই নেক আমল প্রাপককে প্রদান করে
ন্যায়বিচার করবেন। পাওনা পরিশোধের
জন্য পর্যাপ্ত নেক আমল না থাকলে
মজলুমের গোনাহের বোঝা মাথায় নিয়ে
জাহান্নামে যেতে হবে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কেয়ামতের
দিন প্রচুর নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত
নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি
দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা
কারও সম্পদ আত্মসাৎ করে আসবে। এরপর
এসব (মজলুম) ব্যক্তির মধ্যে তার পুণ্যকর্ম
দিয়ে দেয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে
যাবে মজলুমদের পাপ কাজ তার ঘাড়ে
চাপিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা
হবে।' (তিরমিজি)।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আপনি ঋণ পরিশোধ করেননি, এ অবস্থায় যদি আপনার মৃত্যু হয় তাহলে কে বইবে আপনার ঋণের বোঝা?
নিজের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে
অন্যকে মুসিবতে ফেলে রাসূলুল্লাহ (সা.)
এমন ঋণখেলাপির জানাজা পড়তেন না।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত,
একদা নবীজি (সা.) এর কাছে এক
ব্যক্তির লাশ নিয়ে এলে নবীজি বলেন
'তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়;
কারণ সে ঋণী। তখন হজরত আবু কাতাদা
বললেন তার ঋণের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি।
নবীজি বললেন তুমি কি তার ঋণ পরিশোধ
করবে? তিনি বললেন হ্যাঁ। অতঃপর
নবীজি (সা.) তার জানাজা
পড়লেন।' (তিরমিজি : ৩/৩৮১)।
ঋণ পরিশোধের প্রবল ইচ্ছা থাকা
সত্ত্বেও অপারগতাবশত সময়মতো ঋণ
পরিশোধ করতে পারে না, এ ধরনের
ঋণখেলাপিকে অবকাশ দিয়েছে ইসলাম।
এরশাদ হয়েছে, 'ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত
হলে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময়
দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও,
তবে তা খুবই উত্তম; যদি তোমরা উপলব্ধি
করো।' (সূরা বাকারা : ২৮০)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'দয়াবানের প্রতি
পরম করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। অতএব
তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো,
তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি
তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।' (তিরমিজি : ৪/৩২৩)।
হজরত আবুল ইয়াছার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি,
'যে ব্যক্তি কোনো অভাবী ঋণী
ব্যক্তিকে অবকাশ দেবে বা ঋণের বোঝা
লাঘব করে দেবে আল্লাহ তায়ালা তাকে
সেদিন তার ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন
তার ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া
থাকবে না।' (মুসনাদে আহমাদ)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি কেয়ামতের
দিনের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে
চায় সে যেন অভাবগ্রস্ত ঋণী ব্যক্তিকে
অবকাশ দেয় বা ঋণ লাঘব করে।' (মুসলিম)।
অনিবার্য কারণে ঋণ পরিশোধে
অপারগতা দেখা দিলে মিথ্যা আশ্বাস
দেয়া কিছুতেই উচিত নয়। নির্ধারিত
সময়ের আগেই অবহিত করতে হবে
ঋণদাতাকে। সময়মতো ঋণ পরিশোধে
ব্যর্থ হয়ে লজ্জায় ওই ব্যক্তির সঙ্গে
সাক্ষাৎ না করা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
করা শুধু পরস্পরের সম্পর্কচ্ছেদকেই
ত্বরান্বিত করবে। মুমূর্ষু ব্যক্তির ঋণজনিত
কোনো হক অনাদায়ী থাকলে তার কর্তব্য
হলো তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে
তা পরিশোধের অসিয়ত করা।
সূরা নিসার ১১নং আয়াতে মৃত ব্যক্তির ঋণ
পরিশোধের পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের
নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

No comments:

Post a Comment