Tuesday, June 23, 2015

রমযানের ফযিলতের মাসায়েলঃ



Gazi Abdul Hannan's photo.

রমযানের ফযিলতের মাসায়েলঃ
========================
আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
-যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রামাযানের ছিয়াম পালন করে, তার বিগত সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
[বুখারী হা/বুখারী হা/৩৮,১৮৭৫; মুসলীম হা/১৮১৭; আবু দাউদ হা/১৩৭২; ইবনু মাজাহ হা/১৬৪১; নাসাঈ হা/২২০৩;
বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমান হা/৩৩৩৭; আহমাদ হা/৭১৭০]
অপর একটি হাদীসে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إذا دَخَلَ شَهرُ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبوَابُ جَهَنَّمَ، وسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ» رَوَاهُ الشَّيخَان.
-যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলা হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় এবং শয়তানগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। [বুখারি হা/১৮০০; মুসলিম হা/১০৭৯]
অপর বর্ণনায় আছে,
«إذا كَانَ أَوَّلُ ليْلَةٍ من شَهرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّياطِينُ ومَرَدَةُ الجِنِّ، وغُلِّقَتْ أبوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ منْهَا بَابٌ، وفُتِحَتْ أَبوَابُ الجَنَّةِ فلمْ يُغْلَقْ منْها بَابٌ، ويُنَادِي مُنَادٍ: يا بَاغِيَ الخَيرِ: أَقْبِلْ، ويا بَاغِيَ الشَّر: أَقْصِرْ، ولله عُتَقَاءُ مِنَ النَّار وذَلكَ كُلَّ لَيْلَةٍ».
-যখন রমযানের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও অবাধ্য জিনগুলো শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করা হয়; খোলা হয় না তার কোন দ্বার, জান্নাতের দুয়ারগুলো খুলে দেয়া হয়; বদ্ধ করা হয় না তার কোন তোরণ। এবং একজন ঘোষক ঘোষণা করে: হে পুণ্যের অন্বেষণকারী, অগ্রসর হও। হে মন্দের অন্বেষণকারী, ক্ষান্ত হও। আর আল্লাহর জন্য রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অনেক বান্দা, এটা প্রত্যেক রাতে হয়। [তিরমিযি হা/৬৮২; ইব্‌ন মাজাহ হা/১৬৪২; সহিহ ইব্‌ন খুযাইমাহ হা/১৮৮৩; সহিহ ইব্‌ন হিব্বান হা/৩৪,৪৩৫; হাকেম ১/৫৮২, হাদীস সহীহ]
হাদিসে বর্ণিত: “হে পুণ্যের অন্বেষণকারী অগ্রসর হও, হে মন্দের অন্বেষণকারী ক্ষান্ত হও”। অর্থ: হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী, তুমি আরো কল্যাণ অনুসন্ধান কর। এটা তোমার মুখ্য সময়, এতে অল্প আমলে তোমাকে অধিক প্রদান করা হবে। আর হে মন্দের প্রত্যাশী, তুমি ক্ষান্ত হও, তওবা কর, এটা তওবা করার মোক্ষম সময়।
অপর বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তার সাহাবিদের সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন,
«أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهرٌ مُبارَكٌ فَرَضَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ صِيَامَهُ، تُفَتَّحُ فيه أَبوَابُ السَّمَاءِ، وتُغْلَّقُ فِيهِ أَبْوَابُ الجَحِيمِ، وتُغَلُّ فيه مَرَدَةُ الشَّياطِينِ، لله فيهِ لَيلَةٌ خَيرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيرَهَا فَقَدْ حُرِم».
-তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমযান এসেছে, আল্লাহ এর সওম ফরয করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বারসমূহ খোলা হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয়, শিকলে বেঁধে রাখা হয় শয়তানগুলো। এতে একটি রজনী রয়েছে যা সহস্র মাস থেকে উত্তম। যে তার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল, সে প্রকৃত অর্থে বঞ্চিত হল। [নাসায়ি ৪/১২৯; আহমদ ২/২৩০; আব্দু ইব্‌ন হুমাইদ হা/১৪২৯]
আবু হুরায়রা অথবা আবুসাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إِنَّ لله عُتَقَاءَ في كُلِّ يَوْمٍٍ ولَيلَةٍ، لكُلِّ عَبدٍ مِنْهُم دَعوَةٌ مُستَجَابَةٌ» رواه أحمد.
-প্রত্যেক দিনে ও রাতে আল্লাহর মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে দো‘আ কবুলের প্রতিশ্রুতি। [আহমদ ২/২৫৪, তাবরানি ফিল আওসাত (৬/২৫৭), বিশুদ্ধ সনদে]
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إنَّ لله عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وذَلكَ كُلَّ لَيلَة» رواه ابن ماجه.
-প্রত্যেক ইফতারের সময় আল্লাহর মুক্তি প্রাপ্ত বান্দা রয়েছে, আর তা প্রত্যেক রাতে। [ ইব্‌ন মাজাহ হা/১৬৪৩]
■শিক্ষা ও মাসায়েলঃ
=================
✔১). রমযান মাসের ফযিলত যে, এতে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় ও শয়তানগুলো শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। রমযানের প্রত্যেক রাতে তা সংঘটিত হয়, শেষ রমযান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
✔২). এসব হাদিস প্রমাণ করে যে, জান্নাত-জাহান্নাম আল্লাহর সৃষ্ট দু’টি বস্তু, এগুলোর দরজাসমূহ প্রকৃত অর্থে খোলা ও বদ্ধ করা হয়। [দেখুন: শারহু ইব্‌ন বাত্তাল: (৪/২০), আল-মুফহিম: (৩/১৩৬)]
✔৩). ফযিলতপূর্ণ মৌসুম ও তাতে সম্পাদিত আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ, যে কারণে জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয়।
✔৪). রমযানের সুসংবাদ প্রদান ও তার শুভেচ্ছা বিনিময় বৈধ। কারণ সাহাবিদের সুসংবাদ প্রদান ও তাদেরকে আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের এসব বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিতেন। অনুরূপ প্রত্যেক কল্যাণের সুসংবাদ প্রদান বৈধ।
✔৫). অবাধ্য শয়তানগুলো এ মাসে আবদ্ধ করা হয়, ফলে তাদের প্রভাব কমে যায় ও মানুষ অধিক আমল করার সুযোগ পায়।
✔৬). বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের সিয়াম হিফাজত করেন, তাদের থেকে অবাধ্য শয়তানের প্রভাব দূর করেন, যেন সে তাদের ইবাদত বিনষ্ট করার সুযোগ না পায়। [যাখিরাতুল উকবা: (২০/২৫৫)]
✔৭). এসব হাদিস থেকে শয়তানের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলে। তাদের শরীর রয়েছে, যা শিকলে বাঁধা যায়। তাদের কতিপয় অবাধ্য, রমযানে যাদেরকে শৃঙ্খলবদ্ধ করা হয়। [যাখিরাতুল উকবা: (২০/২৫৫)]
✔৮). রমযানের বিশেষ মর্যাদা সেসব মুমিনগণ অর্জন করবে, যারা এর যথাযথ মর্যাদায় দেয় ও এতে আল্লাহর বিধান পালন করে। পক্ষান্তরে কাফের, যারা এতে পানাহার করে, এর কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় না। তাদের শয়তানগুলো বন্দি করা হয় না, তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তির যোগ্য নয়। [দেখুন: ফাতাওয়া শায়খুল ইসলাম: (৫/১৩১-৪৭৪)]
অতএব এ মাসে তাদের মৃতরা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না।
✔৯). যে মুসলিম কাফেরদের সঙ্গে মিল রাখল, যেমন রমযানের মূ‌ল্য দিল না, এতে পানাহার করল, সওম ভঙ্গকারী কাজ করল, অথবা সওমের সওয়াব হ্রাসকারী কর্মে লিপ্ত হল, যেমন গীবত, চোগলখুরী, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও এসব বৈঠকে উপস্থিত হওয়া, বলা যায় সে রমযানের ফযিলত থেকে বঞ্চিত হবে, তার জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হবে না, তার শয়তানগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকবে না।
✔১০). মহান আল্লাহ জান্নাতের প্রশংসায় বলেছেন,
جَنَّٰتِ عَدۡنٖ مُّفَتَّحَةٗ لَّهُمُ ٱلۡأَبۡوَٰبُ
-চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দরজাসমূহ থাকবে তাদের জন্য উন্মুক্ত। [সূরা সাদ: (৫০)]
এ আয়াত রমযানের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের বিপরীত নয়, কারণ এ আয়াত জান্নাতের দরজাসমূহ সর্বদা উন্মুক্ত থাকার দাবি করে না। দ্বিতীয়ত এ আয়াত কিয়ামতের দিন সম্পর্কে। অনুরূপ জাহান্নাম সম্পর্কে সুরায়ে জুমারের ৭১নং আয়াত বলা হয়েছে,
﴿حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءُوهَا فُتِحَتۡ أَبۡوَٰبُهَا ٧١﴾ [الزمر: 71]
-অবশেষে তারা যখন জাহান্নামের কাছে এসে পৌঁছবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে। হতে পারে এর পূর্বে জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ থাকব। [যাখিরাতুল উকবা (২০/২৫৩) ]
✔১১). লাইলাতুল কদর ফযিলতপূর্ণ। এ রাত লাইলাতুল কদর বিহীন হাজার মাস থেকে উত্তম। এ রাতের বরকত থেকে যে মাহরুম হল, সে অনেক কল্যাণ থেকে মাহরুম হল।
✔১২). রমযানের প্রত্যেক রাতে আল্লাহর মুক্ত করা কতিপয় বান্দা থাকে। যারা আল্লাহর মহব্বত, সওয়াবের আশা ও শাস্তির ভয়ে সওম রাখে, সওম হিফাজত করে, কিয়াম করে, ইহসানের প্রতি যত্নশীল থাকে ও অধিক নেক আমল করে, তারা মুক্তির বেশী হকদার।
✔১৩). জাহান্নাম থেকে মুক্ত এসব বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ কবুলের ওয়াদা রয়েছে। তারা দু’টি কল্যাণ লাভ করেছে: জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও দো‘আ কবুলের প্রতিশ্রুতি।
✔১৪). মুসলিমদের উচিত সওয়াব বিনষ্ট বা হ্রাসকারী কর্ম থেকে সওম হিফাজত করা, যেমন চোখ, কান ও জবান সংরক্ষণ করা, তাহলে ইনশাআল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ মিলবে।
✔১৫). সওম পালনকারীর উচিত অধিক দো‘আ করা, কারণ তার দো‘আ কবুলের সম্ভাবনা রয়েছে।
[বিস্তারিত ফাতাওয়া ইব্‌ন বায: (১৫/৬২)]

No comments:

Post a Comment