
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শর্তসমূহ
============
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর বদৌলতে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক ফযীলত, উপকার ও কল্যাণ হাসিল হয়, তবে মুসলিম হিসেবে প্রত্যেকের জানা উচিৎ যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুখে উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার হক ও ফরযসমূহ আদায় করা এবং তার শর্তসমূহ পূর্ণ করা জরুরি, যা কুরআন ও সুন্নাহয় রয়েছে। একটি বিষয় প্রত্যেক মুসলিম জানে যে, যেসব ইবাদত দ্বারা আমরা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করি সেসব ইবাদাতের নিজস্ব কিছু শর্ত রয়েছে, যা ব্যতীত সংশ্লিষ্ট ইবাদাত গ্রহণ করা হয় না। যেমন, সালাত অযু ব্যতীত গ্রহণ করা হয় না, অনুরূপ হজ তার শর্ত ব্যতীত গ্রহণ করা হয় না, অনুরূপ সকল ইবাদাত নির্ধারিত শর্ত ব্যতীত গ্রহণ করা হয় না, যেসব শর্ত কুরআন ও সন্নাহয় বিধৃত হয়েছে। অনুরূপ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ গ্রহণ করা হয় না, যতক্ষণ না বান্দা তার শর্তসমূহ পূরণ করবে, যার বর্ণনা কুরআন ও হাদীসে এসেছে।
আমাদের আদর্শ পূর্বসূরিগণ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শর্তের ওপর জোর তাগিদ করেছেন। কারণ, শর্ত বাস্তবায়ন করা ব্যতীত লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন, হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: “কতক লোক বলে: যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে সে জান্নাতে যাবে। তিনি বললেন: যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং তার হক ও ফরযসমূহ আদায় করবে সে জান্নাতে যাবে”।
প্রসিদ্ধ আরবি কবি ফারাযদাক স্বীয় স্ত্রীকে দাফন করছিলেন, তখন হাসান বসরী তাকে বলেন, এ দিনের জন্য কী প্রস্তুত করেছ? সে বলল: সত্তর বছর যাবৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষীকে প্রস্তুত করছি। হাসান বসরী বললেন: তোমার প্রস্তুতি খুব সুন্দর; কিন্তু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর কতিপয় শর্ত রয়েছে। খবরদার সতী-সাধ্বী নারীকে কখনো অপবাদ দিবে না”।
ওহাব ইবন মুনাব্বিহ জনৈক ব্যক্তিকে বলেন, যে তাকে প্রশ্ন করে ছিল: “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কি জান্নাতের চাবি নয়? তিনি বললেন: অবশ্যই, তবে প্রত্যেক চাবির দাঁত রয়েছে, তুমি যদি দাঁত বিশিষ্ট চাবি নিয়ে আস তোমার জন্য খোলা হবে, অন্যথায় খোলা হবে না। তিনি দাঁত বলে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শর্তের দিকে ইশারা করেছেন”।
এসব বাণী (আসার) ইবন রজব ‘কালিমাতুল ইখলাস’ (পৃ. ১৪) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
কুরআন ও সুন্নাহ অনুসন্ধান শেষে আহলে ইলমদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে যে, সাতটি শর্ত ব্যতীত লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ গ্রহণযোগ্য নয়, সেগুলো হচ্ছে:
১. কালেমার অর্থ জানা, অর্থাৎ কালেমার ভেতর কী অস্বীকার ও কী সাব্যস্ত করা হয়েছে তা জানা জরুরি, যা তার অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞতার বিপরীত।
২. কালেমার ভেতর যা সাব্যস্ত করা হয়েছে তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা জরুরি, যা কালেমা সম্পর্কে সংশয় ও সন্দেহ পোষণ করার বিপরীত।
৩. কালেমার প্রতি পূর্ণ ইখলাস প্রদর্শন করা জরুরি, যা তার অর্থ ও দাবি বাস্তবায়ন করার সময় শির্ক ও রিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার বিপরীত।
৪. কালেমাকে মনে-প্রাণে সত্য জানা জরুরি, যা তার প্রতি মিথ্যারোপ করার বিপরীত।
৫. কালেমায় সাব্যস্ত সত্তাকে (আল্লাহকে) মহব্বত করা জরুরি, যা তার প্রতি কোনো প্রকার বিদ্বেষ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার বিপরীত।
৬. কালেমার অর্থ ও দাবির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা জরুরি, যা তার অর্থ ও দাবিকে ত্যাগ করার বিপরীত।
৭. কালেমার অর্থ ও দাবি মনে-প্রাণে গ্রহণ করা জরুরি, যা তার অর্থ ও দাবির বাস্তবায়নকে প্রতিরোধ করার বিপরীত।
সাতটি শর্তকে জনৈক আহলে-ইলম এক কবিতায় একত্র করেছেন, যেমন:
علم يقين وإخلاص وصدقك مع
محبة وانقياد والقبول لها
১. ‘ইলম’ অর্থাৎ অর্থ ও দাবি জানা, ২. ‘ইয়াকিন’ অর্থাৎ অর্থ ও দাবিকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, ৩. ‘ইখলাস’ অর্থাৎ অর্থ ও দাবিকে বাস্তবায়ন করার সময় রিয়া ও শির্কে লিপ্ত না হওয়া। ৪. ‘সিদক’ অর্থাৎ কালেমার অর্থ ও দাবির প্রতি সত্যারোপ করা। ৫. ‘মহব্বত’ অর্থাৎ কালেমায় সাব্যস্ত সত্তাকে মহব্বত করা, ৬. ‘ইনকিয়াদ’ অর্থাৎ কালেমায় সাব্যস্ত সত্তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন করা, ও ৭. ‘কবুল’ অর্থাৎ কালেমার অর্থ ও দাবিকে সানন্দে গ্রহণ করা।
No comments:
Post a Comment