Saturday, July 2, 2016

নারীদের মাসিক অসুস্থতার সময়ে লাইলাতুল কদরের ইবাদাত।





বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর কবে হবে, কখন হবে তা নিয়ে অনেক বর্ণনা আমরা পাই। এসকল বর্ণনার মধ্যে সবচেয়ে সঠিক বর্ণনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, মোটা দাগে লাইলাতুল কদর হবে শেষ ১০ রাত্রির যে কোন এক রাতে। আরও কাছ থেকে দেখলে দেখা যাবে বেজোড় রাত্রিগুলোর কথা হচ্ছে। এমনকি এই ধরণের বর্ণনাও পাওয়া যাবে যেখানে রসুল (সঃ) আমাদের ২১ বা ২৭ রমাদানে লাইলাতুল কদরের কথা বলেছেন নির্দিষ্ট করেই। কিন্তু রসুল (সঃ) এর সুন্নাহ হচ্ছে শেষ দশক পুরোটাই ইবাদাতে লিপ্ত থাকা। বিশেষ করে নিজেকে একা করে মাসজিদে অবস্থান করার মাধ্যমে ইবাদাতে লেগে যাওয়া। যাকে বলা হচ্ছে ইতিক্বাফ।
.
রসুল (সঃ) এর কথা তো বুঝলাম। কিন্তু, যে সকল বোনদের মাসিক অসুস্থতা চলছে, তারা কি করে লাইলাতুল কদর থেকে উপকৃত হতে পারে? কারন, শরীরের এমন অবস্থায় না তিনি সলাত পড়তে পারছেন, না রোজা রাখতে পারছেন, না কুর’আন তিলাওয়াত করতে কিংবা ছুতে পারছেন। তাহলে ব্যাপারটা কি এমন দাঁড়াচ্ছে যে, আল্লাহ তাকে এমন এক রাতের ইবাদাত থেকে বঞ্চিত করছেন যা হাজার মাস ইবাদাতের সমতুল্য? না, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। তাহলে ব্যাপারটা কেমন? সে কথাই আজ বলব ইনশাআ আল্লাহ।
.
১) জানেন কি, ইবাদাত না করার মাধ্যমেই আপনি ইবাদাত করছেনঃ
.
শিরোনামটা বোধয় একটু পরস্পর বিরোধী হয়ে গেল, তাই না? অথচ বাস্তবতা কিন্তু এটাই। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য।(১) এর অর্থ দাঁড়ায় আপনার শারীরিক এই অবস্থায় সলাত না পড়ার মাধ্যমে, রোজা না রাখার মাধ্যমে কিংবা কুর’আন না স্পর্শ করার মাধ্যমে আপনি আল্লাহর নিষেধ মেনে তাঁর এবং তাঁর রসূলের (সঃ) আনুগত্যই করছেন। তাই, ভাববেন না আল্লাহ আপনাকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছেন। বরং আল্লাহ আপনাকে পুরষ্কৃতই করছেন।

একজন আলেম একবার বলেছিলেন, নারীর পবিত্র অবস্থায় সলাত পড়া উপাসনা। আবার, মাসিক অসুস্থতার সময় সলাত ছেড়ে দেয়াটাও উপাসনা। পুরো ব্যাপারটাই তার জন্য উপাসনার।“
.
২) আপনি আপনার নিয়তের জন্যও পুরষ্কৃত হবেনঃ

বাস্তবিক অর্থেই যদি আপনি এটাই কামনা করতেন যে, এই অসুস্থতা যেন এই বিশেষ সময়ে না আসে যেন আপনি রমাদানের এই লগ্নে নিজেকে ইবাদাতে মশগুল রাখতে পারেন তবে ইনশা আল্লাহ আপনি আপনার এই মনোবাসনার জন্যেও আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কৃত হবেন। এবং বাস্তবতা তো এটাই যে, এমন কোন কারণে অপারগ হলে, ভালো কাজের নিয়তের জন্য পুরস্কার দেয়া হবে ততটুকুই যতটুকু আপনি পেতেন ভালো কাজটি করার মাধ্যমে। পুরো সওয়াবটাই ইনশা আল্লাহ। আশায় থাকুন, ইবাদাতের মনোবাসনা যদি থেকেই থাকে তাহলে এই অবস্থাতেও আপনি কিছুই হারাচ্ছেন না।
.

৩) কুর’আন তিলাওয়াত শ্রবণ করাঃ
লক্ষ্য করুন, কুর’আন আল্লাহ নাজিল করেছেন কথিত রূপে। যখন কুর’আন শ্রবণ করা হয়, সেটাই কিন্তু এক প্রকার ইবাদাত। কুর’আন শ্রবণ করা, তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা, এর অর্থের বোঝার চেষ্টা করা- সবই ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। যদি আরবী না বুঝতে পারেন, তাহলে এমন কোন ভিডিও দেখতে পারেন যাতে তিলাওয়াতের সাথে অর্থও দেখানো হয়। অথবা, এমন অডিও তিলাওয়াত যেখানে তিলাওয়াতের পরে এর অর্থটাও বলে দেয়া হয়। অথবা, আলেমদের কোন তাফসীর অনুষ্ঠান শুনতে পারেন। এসব ম্যাটেরিয়ালস এখন আমাদের নখদর্পনেই আছে।
.
কুর’আন শোনার সময় যখন জাহান্নামের কথা বলা হচ্ছে তখন আল্লাহর কাছে দু’আ করুন যেন তিনি তা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। অন্যদিকে আল্লাহর প্রশংসা করুন, যখন জান্নাতের নিয়ামতের কথা বলা হচ্ছে। যখন, সামনে আসছে পুণ্যবানদের কথা, তাদের মত হবার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করুন। অন্যদিকে যখন সামনে আসছে পথভ্রষ্টদের কিংবা অভিশপ্তদের দুর্দশার কথা, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে দু’আ করুন যেন তাদের মত আমরা না হয়ে যাই।
.
৪) খুব বেশি করে স্বরণ করুন আল্লাহকেঃ

আপনি হয়ত সলাত বা সাওম রাখতে পারছেন না। কিন্তু, আল্লাহর স্বরণ (জিকির) তো করতে পারছেন। রসুল(সঃ) এর একটা চমৎকার হাদিসের কথা বলতে চাই আপনাকে।
রসুল (সঃ) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের আমলসমূহের সর্বোত্তমটি সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবো না, যা তোমাদের প্রভুর নিকট সর্বাধিক প্রিয়, তোমাদের মর্যাদাকে অধিক উন্নীতকারী, তোমাদের সোনা-রূপা দান করার চেয়ে এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তোমাদের শত্রুদের হত্যা করা এবং তোমাদের নিহত হওয়ার চেয়ে উত্তম?”
সাহাবীগণ বলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেটি কী?”
তিনি বলেন, “আল্লাহর যিকির।“
মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, কোন মানুষের জন্য আল্লাহর যিকিরের চেয়ে উত্তম কোন আমল নাই, যা তাকে মহামহিম আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারে। (২)
আল্লাহ আপনার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন শ্রেষ্ঠ আমলের দরজাটি – সুযোগটার সৎ ব্যবহার করুন।
বিখ্যাত হানাফি আলেম ও ফাকিহ ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মাসিক অসুস্থতার সময়গুলোতে বোনেরা যেন সলাতের সময়টাতে ওজু করে নেন। এরপরে নিজের অবস্থানে বসে যে সময়টা সলাত পড়তেন, সেই সময়টাতে আল্লাহর জিকির করেন। এর ফলে, একদিকে তিনি সলাত আদায়ের অভ্যাসটা ধরে রাখতে পারবেন, অন্যদিকে এই সময়টাতে তিনি আল্লাহর উপাসনাতেও কাটাতে পারছেন।
৫) রসুল (সঃ) এর প্রতি সলাত পাঠ করাঃ
আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর। (৩)
আল্লাহ বলেননি আর কোন কাজের কথা, যা তিনি করেন, তাঁর ফিরিশতারা করেন এবং বিশ্বাসীরাও করে থাকেন শুধুমাত্র রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সলাত বর্ষণ ছাড়া। আসুননা, এই দুরুদ পড়ার ব্যাপারটাকে এত করে আমল করি যেন তা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। আসুননা, বারবার রসূলের প্রতি সালাত পাঠ করে অন্তত এতটুকু হলেও পড়ি “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” কিংবা “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ”।
৬) দানের হাতকে প্রসারিত করুনঃ
রসুল (সঃ) এমনিতেই খুব দানশীল ছিলেন।। কিন্তু, যখন রমাদান আসত তখন তাঁর দানশীলতা আরও অনেক বেশি প্রসারিত হত। যেন তা বয়ে চলা শীতল বাতাসের মত। রসুল সঃ বলেছেন, রমাদানের দান হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম। দান করা ঈমানের পরিচায়ক। তিনি আরও বলেছেন, দান করা জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
আপনাকে অনুপ্রানিত করার জন্য আর কিছু কি দরকার আছে?
৭) বেশি বেশি দু’আ করুনঃ
রসুল (সঃ) বলেছেন, দু’আ-ই হচ্ছে ইবাদাত।(৭) আল্লাহ বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।(৮) তাছাড়া রমাদান হচ্ছে দু’আ কবুলের মাস।
এই সংক্ষিপ্ত তালিকার বাইরেও আরও অনেক কিছুই করা যায়। আপাতত এটুকুই জানালাম আমাদের পক্ষ থেকে। হয়ত বছরের সেরা রাতটিতে সলাত পড়তে পারছেন না, কিন্তু আশা করি অন্য ইবাদাত মিস হবে না, ইনশা আল্লাহ।
রেফারেন্সঃ-
১) সুরা নূর: ৫২
২) আবূ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আকি কি তোমাদের আমলসমূহের সর্বোত্তমটি সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবো না, যা তোমাদের প্রভুর নিকট সর্বাধিক প্রিয়, তোমাদের মর্যাদাকে অধিক উন্নীতকারী, তোমাদের সোনা-রূপা দান করার চেয়ে এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তোমাদের শক্রুদের হত্যা করা এবং তোমাদের নিহত হওয়ার চেয়ে উত্তম? সাহাবীগণ বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেটি কী? তিনি বলেনঃ আল্লাহর যিকির। মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, কোন মানুষের জন্য আল্লাহর যিকিরের চেয়ে উত্তম কোন আমল নাই, যা তাকে মহামহিম আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারে। (সুনান ইবনে মাজাহ ৩৭৯০)
৩) সুরা আহযাব: ৫৬
৪) নু’মান ইবনে বাশির রাঃ থেকে বর্ণিত, রসুল সঃ বলেছেন, দু’আই হল ইবাদাত। তিরমিযী ৩৩৭২,২৯৬৯,৩২৪৭
৫) সুরা গাফের: ৬০

No comments:

Post a Comment