
কুরবানীতে শরীক হওয়া:
---------------------------------
আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,
(ক) অর্থঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হ’ল। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরীক হ’লাম’। [25]
(খ) হযরত জাবির (রাঃ) বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ্জ ও ওমরাহর সফরে সাথী ছিলাম। তখন আমরা একটি গরু ও উটে সাতজন করে শরীক হয়েছিলাম’। [26] সফরে সাত বা দশজন মিলে একটি পরিবারের ন্যায়। যাতে গরু বা উটের ন্যায় বড় পশু যবই ও কুটাবাছা এবং গোশত বন্টন সহজ হয়। জমহূর বিদ্বানগণের মতে হজ্জের হাদ্ঈর ন্যায় কুরবানীতেও শরীক হওয়া চলবে। [27]
(গ) হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হজ্জের সফরে মিনায় নিজ হাতে ৭টি উট (অন্য বর্ণনায় এর অধিক) দাঁড়ানো অবস্থায় ‘নহর’ করেছেন এবং মদীনায় (মুক্বীম অবস্থায়) দু’টি সুন্দর শিংওয়ালা ‘খাসি’ কুরবানী করেছেন’। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সফরসঙ্গী স্ত্রী ও পরিবারের পক্ষ হ’তে একটি গরু কুরবানী করেন’। [28] অবশ্য মক্কায় (মিনায়) নহরকৃত উটগুলি ছাহাবীগণের পক্ষ থেকেও হ’তে পারে।
আলোচনা: ইবনু আববাস (রাঃ)-এর হাদীছটি নাসাঈ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহতে, জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি মুসলিম ও আবুদাঊদে এবং আনাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি বুখারীতে সংকলিত হয়েছে। মুসলিম ও বুখারীতে যথাক্রমে ‘হজ্জ’ ও ‘মানাসিক’ অধ্যায়ে এবং সুনানে ‘কুরবানী’ অধ্যায়ে হাদীছগুলি এসেছে।
যেমন:
(১) তিরমিযী ‘কুরবানীতে শরীক হওয়া’ অধ্যায়ে ইবনু আববাস, জাবির ও আলী (রাঃ) থেকে মোট তিনটি হাদীছ এনেছেন। যার মধ্যে প্রথম দু’টি সফরের কুরবানী ও শেষেরটিতে কোন ব্যাখ্যা নেই। [29]
(২) ইবনু মাজাহ উক্ত মর্মের শিরোনামে ইবনু আববাস, জাবের, আবু হুরায়রা ও আয়েশা (রাঃ) হ’তে যে পাঁচটি হাদীছ (৩১৩১-৩৪ নং) এনেছেন, তার সবগুলিই সফরে কুরবানী সংক্রান্ত।
(৩) নাসাঈ কেবলমাত্র ইবনু আববাস ও জাবির (রাঃ) থেকে পূর্বের দু’টি হাদীছ (২৩৯৭-৯৮ নং) এনেছেন।
(৪) আবু দাঊদ শুধুমাত্র জাবির (রাঃ)-এর পূর্ব বর্ণিত সফরে কুরবানীর হাদীছটি এনেছেন তিনটি ছহীহ সনদে (২৮০৭-৯ নং), যার মধ্যে ২৮০৮ নং হাদীছটিতে اَلْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْجَزُوْرُ عَنْ سَبْعَةٍ) ) কোন ব্যাখ্যা নেই।
বিভ্রাটের কারণ: মিশকাত শরীফে ইবনু আববাস (রাঃ)-এর সফরের হাদীছটি (নং ১৪৬৯) এবং জাবির (রাঃ) বর্ণিত ব্যাখ্যাশূন্য হাদীছটি (নং ১৪৫৮) সংকলিত হয়েছে। সম্ভবতঃ জাবির (রাঃ) বর্ণিত ‘মুত্বলাক্ব’ বা ব্যাখ্যাশূন্য হাদীছটিকে ভিত্তি করেই এদেশে মুক্বীম অবস্থায় গরুতে সাতভাগা কুরবানীর প্রথা চালু হয়েছে। অথচ ভাগের বিষয়টি সফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা ইবনু আববাস ও জাবির (রাঃ) বর্ণিত বিস্তারিত হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। [30] আর একই রাবীর বর্ণিত সংক্ষিপ্ত হাদীছের স্থলে বিস্তারিত ও ব্যাখ্যা সম্বলিত হাদীছ দলীলের ক্ষেত্রে গ্রহণ করাই মুহাদ্দিছগণের সর্ববাদী সম্মত রীতি।
তাছাড়া মুক্বীম অবস্থায় মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বা ছাহাবায়ে কেরাম কখনো ভাগে কুরবানী করেছেন বলেও জানা যায় না। ইমাম মালেক (রহঃ) কুরবানীতে শরীক হওয়ার বিষয়টিকে মকরূহ মনে করতেন। [31] দুঃখের বিষয়, বর্তমানে এদেশে কেবল সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নয়, বরং মুক্বীম অবস্থায় সাত পরিবারের সাত -এর অধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী দেওয়া হচ্ছে। সেই সাথে অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে ভাগা নিয়ে অনাকাংখিত বিবাদ ও মনকষাকষি।
পরিশেষে যদি কেউ বলেন, মুক্বীম অবস্থায় ভাগা কুরবানীর ব্যাপারে তো কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। উত্তরে বলা চলে যে, এ ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কোন নির্দেশ বা আমলও নেই। অথচ কুরবানী হ’ল একটি ইবাদত। যা রাসূলের তরীকা অনুযায়ী সম্পন্ন করা অপরিহার্য। যেটা তিনি বলেছেন বা করেছেন, সেটাই শরী‘আত। যা তিনি বলেননি বা করেননি, সেটা শরী‘আত নয়। যেটা তিনি করেননি সেটা করার মাধ্যমে কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিল করা যাবে?
বিগত বিদ্বানগণের যুগে সম্ভবতঃ মুক্বীম অবস্থায় ভাগা কুরবানীর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। যেমন আজকাল পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানীর সাথে একটি গরুর ভাগা নেওয়া হচ্ছে মূলতঃ গোশত বেশী পাবার স্বার্থে। ‘নিয়ত’ যখন গোশত খাওয়া, তখন কুরবানীর উদ্দেশ্য কিভাবে হাছিল হবে? অনেকে হাযার হাযার টাকা দিয়ে বড় গরুর ভাগী হন। কিন্তু তার অর্ধেক টাকা দিয়ে একটি ছাগল কিনতে রাযী নন। এর দ্বারা কি বুঝা যায়? ‘কুরবানী’ হ’ল পিতা ইবরাহীমের সুন্নাত। যা তিনি পুত্র ইসমাঈলের জীবনের বিনিময়ে করেছিলেন। আর তা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ হ’তে পাঠানো একটি পশুর জীবন অর্থাৎ দুম্বা।
এক্ষণে যদি আমরা ভাগা কুরবানী করি, তাহ’লে পশুর হাড়-হাড্ডি ও গোশত ভাগ করতে পারব, কিন্তু তার জীবন ভাগ করতে পারব কি? গোশত সাত জনের ভাগে গেল, কিন্তু পশুর জীবনটা কার ভাগে গেল? অতএব ইবরাহীমী ও মুহাম্মাদী সুন্নাতের অনুসরণে নিজের ও নিজ পরিবারের পক্ষ হ’তে আল্লাহ্র রাহে একটি জীবন তথা একটি পূর্ণাঙ্গ পশু কুরবানী দেওয়া উচিত, পশুর দেহের কোন খন্ডিত অংশ নয়।
রেফারেন্স সমূহ :
[25]. তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত, হা/১৪৬৯ সনদ ছহীহ।
[26]. মুসলিম (বৈরুতঃ ১৯৮৩) হা/১৩১৮।
[27]. মির‘আত ২/৩৫৫ পৃঃ; ঐ, ৫/৮৪ পৃঃ।
[28]. বুখারী (মীরাট ছাপাঃ ১৩২৮ হিঃ) ১/২৩১ পৃঃ; আলবানী-ছহীহ আবুদাঊদ হা/১৫৩৯।
[29]. তিরমিযী তুহফা সহ, হা/১৫৩৭-৪০, ৫/৮৭-৮৮ পৃঃ।
[30]. মিশকাত হা/১৪৬৯; মুসলিম হা/১৩১৮; বুখারী ১/২৩১ পৃঃ।
[31]. মুওয়াত্ত্বা মালেক (মুলতান ছাপাঃ তারিখ বিহীন) পৃঃ ২৯৯।
No comments:
Post a Comment