
মাযহাব মানা ওয়াজিব না ফরয?
=======================
রাসুল (ﷺ) এর সাথে সবসময় সব সাহাবী থাকতেন না। কেউ নবীর (ﷺ) থেকে একটা হাদিসের বাণী শুনলে সেটা পৌছে দিতেন অন্যের নিকট। যেমন আবু হুরাইরা (رضى الله عنه) নাবী (ﷺ) এর অনেক বাণী পৌছে দিয়েছেন অন্যান্য সাহাবীদের নিকট। যেমন বিদায় হজ্বের সময় ১ লাখেরও বেশী সাহাবী ভাষন শ্রবণ করেছেন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে গিয়েছেন।
.
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে। তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর যতগুলো হাদিস পেয়েছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন সেগুলোর উপর ভিত্তি করেই ফতোয়া দিয়েছিলেন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, উনার সময় তিনিই ছিলেন বিজ্ঞ ইমাম। তবে যেহেতু তিনি সকল সাহাবাদের হাদিস সংগ্রহ করতে পারেন নাই, সকল সাহাবাদের সাক্ষাৎ পান নাই এবং যেহেতু হাদিস এর ধারক সাহাবারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তাই তিনি যতগুলো হাদিস পেয়েছেন তার উপরেই ফতোয়া দিয়েছেন। তাইতো তার ফতোয়ায় অনেক ভুল-ভ্রান্তি ছিলো। একারণেই তার প্রিয় ছাত্রগণ তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফতোয়া গ্রহণ করেন নাই। ইমাম আবু হানিফাও বুঝতেন যে, তিনি হয়তো সকল সহীহ হাদীছের উপর ফতোয়া দিতে পারেন নাই। তাই তো তিনি বলেছেন,
“ইযা সহহাল হাদিসু ফা হুয়া মাজহাবা” অর্থ্যাত বিশুদ্ধ হাদিস পেলে সেটাই আমার মাজহাব বা মতামত। (১/৬৩ ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া, পৃঃ ৬২ ছালিহ আল-ফাল্লানীর, ১/৪৬ শামী)
.
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হে শায়খ, যদি এমন সময় আসে যখন আপনার কথা কোন সহীহ হাদিসের বিপরীতে যাবে তখন আমরা কি করব? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, "তখন তোমরা সেই সহীহ হাদিসের উপরই আমল করবে এবং আমার কথা প্রাচীরে/দেয়ালে নিক্ষেপ করবে।"
.
১৫০ হিজরিতে জন্মগ্রহন কারী ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর বক্তব্য হলো,"তোমরা যখন আমার কিতাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর সুন্নাহ বিরোধী কিছূ পাবে তখন আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত অনুসারে কথা বলবে। আর আমি যা বলেছি তা ছেড়ে দিবে।" (৩/৪৭/১ আল হারাবীর, ৮/২ খত্বীব, ১৫/৯/১ ইবনু আসাকির, ২/৩৬৮ ইবনু কাইয়িম, ১০০ পৃঃ ইহসান ইবনু হিব্বান)।
.
৯৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণকারী ইমাম মালেক রহঃ এর বক্তব্যও একই। ইমাম মালেক বিন আনাস (রহঃ) বলেছেন, "আমি নিছক একজন মানুষ। ভূলও করি শুদ্ধও বলি। তাই তোমরা লক্ষ্য করো আমার অভিমত/মতামত/মাজহাব এর প্রতি। এগুলোর যতটুকু কোরআন ও সুন্নাহ এর সাথে মিলে যায় তা গ্রহণ করো আর যতটুকু এতদুভয়ের সাথে গরমিল হয় তা পরিত্যাগ করো।" (ইবনু আবদিল বর গ্রন্থ (২/৩২)।
.
১৬৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণকারী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ ছিলেন ১০ লক্ষ হাদিসের সংগ্রহ কারী। সবচেয়ে বেশী হাদিস উনার মুখস্থ ছিল এবং উনার সংগ্রহে ছিল। উনার লিখিত গ্রন্থ মুসনাদে আহমাদ এ মাত্র ২৩,০০০ এর মতো হাদিস লিপিবদ্ধ আছে। তিনিও উপরোক্ত ইমামগণের মতই বক্তব্য দিয়েছেন।
.
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সকল ইমামই তাদের মতামতের বিপরীতে কোরআন ও সহীহ হাদিস মেতে চলতে বলেছেন। কিন্তু কেউ যদি বলেন কোরআন হাদীছে যা আছে থাক, আমাদের মাযহাব-ই মানতে হবেই হবে, তাহলে এটা হবে চরম ভুল এবং তা উপরোক্ত সম্মানিত ইমামগণের মানহায পরিপন্থিও বটে।
.
গ্লোবাইজেশনের যুগে জ্ঞান এখন উন্মুক্ত। মানুষ এখন সত্য মিথ্যা যাচাই করতে শিখেছে। সামগ্রিক ইসলামের চিন্তা গবেষনা এখন আর ৪ ইমামের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রত্যেক যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের চিন্তা ও গবেষণার ফল স্বরুপ প্রত্যেক মাস’আলা মাসায়েলে এর কোরআন হাদীছ সম্মত জবাব বের হয়ে আসছে। এভাবে প্রসিদ্ধ ৪ ইমামদের কোন কোন মতামত কোরআন সূন্নাহ এর অনুকুলে আর কোন কোন ফতোয়া কোরআন সুন্নাহ সম্মত নয়, তা মানুষ জানতে পারছে।
.
আলহামদুলিল্লাহ,আলেমগণ এখন আর ফতোয়া দেওয়ার সময় বলে না যে, এটা অমুক ইমামের রায় বা এটা তমুক ইমামের ফতোয়া। বরং তারা ফতোয়া দেওয়ার পর কোরআন এর আয়াত দিচ্ছেন বা হাদীছের উদৃতি পেশ করছেন। হ্যাঁ এ সকল আলেমগণ হয়তো ফতোয়ার সারাংশ সম্পর্কে ইলম হাসিল করার জন্য পূর্ববর্তী ইমামগণের গবেষনার সাহায্য নিয়েছেন। যার গবেষনা কোরআন বা হাদীছের পক্ষে গিয়েছে তারা তা গ্রহণ করেছেন, বাকীদেরগুলো ত্যাগ করেছেন। আর এটাই তো ছিলো ইমামগণের নির্দেশ!
.
কোরআন ও সহীহ হাদীছের দিকে আহবানকারী এই সকল আলেমগণের খেদমতের কারণে আজ সহীহ আক্বীদার লোক দিন দিন বেড়েই চলেছে। আলহামদুলিল্লাহ…!
.
আর যারা এখনও মাযহাবী গোড়ামীতে যুক্ত, তাদের জন্য মহান আল্লাহর এই বানী-
-যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ (কোরআন ও হাদিস অমান্যের মাধ্যমে) করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। [সূরা নিসা-৪:১১৫]
.
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্ পাকের। আসুন আমরা মাযহাবের নামে বিভক্ত না হয়ে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করি যাতে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারি!
No comments:
Post a Comment