Monday, October 20, 2014

প্রতারণা ইসলামে নিষিদ্ধ



প্রতারণা ইসলামে নিষিদ্ধ
প্রতারণা ও ফাঁকি দেয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। কোনো যথার্থ মানুষ এটা করতে পারে না। সত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে অন্যদের বিভ্রান্ত করা সততার পরিপন্থী। আর সততার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, ন্যায়নীতি ও সরলতা। সেখানে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার, ধূর্ততা ও ফাঁকিবাজির কোনো স্থানই নেই। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অনেক বাণীতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রতারণার টার্গেট মুসলিম কী অমুসলিম, যে-ই হোক না কেন, তা সব সময়ই নিষিদ্ধ।
ইসলামের পথনির্দেশনা প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করে নিলে একজন মানুষ সত্যপরায়ণতার দিকে পরিচালিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ তখন তিনি প্রতারণা ও পরনিন্দা পরিহার করে চলেন সর্বতোভাবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের লোক নয় এবং যে কেউ আমাদের প্রতারিত করবে, সে-ও নয় আমাদের লোক (সহিহ মুসলিম)। আরেক হাদিসে জানা যায় রাসূল সা: বাজারে খাদ্যশস্যের স্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এর ভেতরে হাত ঢোকালেন এবং অনুভব করলেন ভেজা ভেজা ভাব। অথচ স্তূপটির বাইরের দিক ছিল শুকনা। তিনি এই পণ্যের মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপার কী?’ লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল সা:, এই শস্য বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। রাসূল সাঃ তাকে বললেন, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যশস্য কেন স্তূপের ওপরের দিকে রাখনি? তা হলে লোকজন তা দেখতে পেত। যে প্রতারক, সে তো আমাদের কেউ নয়।’ (মুসলিম)
মুসলিম সমাজের ভিত্তি অনুভূতির পবিত্রতা, ভালোবাসা, প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি দরদ এবং সমাজের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পূরণ। আর এই সমাজের সদস্যরা আল্লাহর ভয়, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার গুণে গুণান্বিত। প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি সত্যিকারের মুসলমানের সুমহান চরিত্রের বিপরীত। ইসলামে কোনো জায়গা নেই জালিয়াত, বাটপাড়, প্রবঞ্চক, ধূর্ত ও বিশ্বাসঘাতকের।
প্রতারণা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য পাপ। যে এটা করে, তার জন্য তা খুবই লজ্জাকর। আর এই লজ্জা ইহকাল ও পরকাল, উভয় জীবনেই। রাসূল সা: প্রতারকদের নিন্দা করেছেন এবং তাদের মুসলিম সমাজে অন্তর্ভুক্ত করেননি। শুধু তাই নয়; তিনি ঘোষণা করেছেন, শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক প্রতারক বা বিশ্বাসহন্তার পুনরুত্থান ঘটবে ওদের বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা বহন করা অবস্থায়।
হাশরের বিশাল ময়দানে একজন আহ্বানকারী প্রতারকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ এবং ওর প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে চিৎকার দিয়ে বলবেন, পুনরুত্থান দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের একটি করে পতাকা থাকবে এবং তার এই প্রতারণার ধরন তুলে ধরা হবে (সহিহ বুখারি)।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বাসহন্তার লজ্জা হবে বিপুল। যারা মনে করেছিল, তাদের প্রতারণার বিষয়টি ভুলে যাওয়া হয়েছে, তারা সে দিন ঠিকই তা দেখতে পাবে। তখন পুরো দুনিয়া দেখবে, প্রতারকদের নিজ হাতে তুলে ধরা পতাকায় তাদের প্রতারণার কাণ্ডকীর্তির উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামের নবী সা: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন তিন ধরনের লোকের বিরোধিতা করব হাশরের দিন। তারা হলো যে কথা দিয়ে কথা রাখেনি; যে মুক্ত মানুষকে বিক্রি করেছে যাতে সে ক্রীতদাসে পরিণত হয় এবং সে বাবদ তার মূল্য নিয়েছে; আর যে কাউকে ভাড়া করে তার শ্রমে লাভবান হয়েও মজুরি পরিশোধ করেনি (সহিহ আল বুখারি)।
বর্তমান সমাজে প্রচলিত যাবতীয় প্রতারণা থেকেই দূরে থাকা উচিত। আজকাল পরীক্ষার ক্ষেত্রে, ব্যবসার লেনদেনে, এমনকি স্বামী-স্ত্রী কিংবা ভালোবাসার মানুষজনের মধ্যেও প্রতারণা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। দেশী পণ্যের গায়ে লেবেল এঁটে দিয়ে এটাকে বিদেশী দেখানো এক ধরনের জালিয়াতি। কিছু লোকের স্বভাব হলো তাদের কাছ থেকে উপদেশ বা পরামর্শ চাওয়া হলে ভুল বা মন্দ পরামর্শ দিয়ে প্রতারণা করে। অন্য দিকে প্রতারিত ব্যক্তি মনে করেন, তাকে ভালো পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
কোনো কর্মচারী যে কাজের জন্য বেতন বা মজুরি পেয়ে থাকেন, তিনি প্রতারণা না করে সে কাজটিই করা উচিত। শাসকরা নির্বাচনে ‘জেতা’র জন্য ভোটের কারচুপি করে থাকেন এবং এর মধ্য দিয়ে গোটা জাতিকেই প্রতারিত করেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার প্রতারণা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আধুনিক সমাজে ব্যাপক। বাটপাড়-প্রতারকদের মধ্যে যাতে কখনোই অন্তর্ভুক্ত না হন, সে জন্য মুসলমানদের নিজের মর্যাদা উপলব্ধি করতে হবে।
ভণ্ড-প্রতারকদের সম্পর্কে রাসূল সা: বলেছেন, চারটি বৈশিষ্ট্য আছে; যার এগুলোর সব ক’টিই রয়েছে সে প্রকৃত প্রতারক বা মুনাফিক। আর যার মধ্যে দেখা যায় এগুলোর কোনো একটি বৈশিষ্ট্য, তার আছে মোনাফেকির একটি দিক যে পর্যন্ত না সে তা ত্যাগ করে। বৈশিষ্ট্য চারটি হচ্ছে তাকে বিশ্বাস করা হলে সে করে বিশ্বাঘাতকতা। যখন সে কথা বলে, সে বলে থাকে মিথ্যা। ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং ঝগড়া বিবাদের সময় অন্যকে দেয় অপবাদ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
যে মুসলমানের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত অনুভূতি থাকে, সে প্রতারণা, ফাঁকি দেয়া, বিশ্বাসঘাতকতা এবং মিথ্যা বলা বর্জন করে চলে। এসব স্বভাবের কারণে তার কথিত লাভ বা ফায়দা হওয়ার সুযোগ থাকলেও সে এগুলো করে না। কারণ ইসলাম এসব অপকর্মে লিপ্ত অপরাধীদের গণ্য করে মুনাফিক হিসেবে।

No comments:

Post a Comment