
মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্রতম শহর মক্কা শরিফ। এর পরেই যে নগরীটি তাদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র, তা হলো মদিনা শরিফ। মক্কা শরিফে প্রিয় নবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। আর মদিনা শরিফে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর পবিত্র রওজাও সেখানে। রাসুল (সা.) মক্কা শরিফকে অত্যধিক ভালোবাসলেও মদিনা শরিফের ভালোবাসাও ছিল তাঁর হৃদয়ের মণিকোঠায়। নবীজি (সা.) মক্কা শরিফে নবুয়ত লাভ করলেও তা পূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছে মদিনা শরিফে। মক্কাবাসী ইসলামের তারকাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার অপপ্রয়াসে প্রবৃত্ত হলেও মদিনাবাসী অনুক্ষণ নিবিষ্ট ছিল এই প্রদীপকে আরো অধিকতর প্রোজ্জ্বল করার প্রচেষ্টায়। এখানেই মক্কাবাসীর ওপর মদিনাবাসীর শ্রেষ্ঠত্ব।
নাড়ির সম্পর্ক
মদিনার সঙ্গে ছিল রাসুল (সা.)-এর নাড়ির সম্পর্ক, আত্মার বন্ধন। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.)-এর প্রপিতামহ হাশিম তৎকালীন ইয়াসরিব, অর্থাৎ মদিনার প্রসিদ্ধ গোত্র বনু নাজ্জারের সালমা নামের এক গুণবতী মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁর ঔরসেই জন্মগ্রহণ করেন রাসুল (সা.)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব। মক্কা শরিফ থেকে মদিনা শরিফ হিজরত করার প্রাক্কালে রাসুল (সা.) যখন বনু নাজ্জারের মহল্লা দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন মহল্লার ছোট শিশু ও কিশোরীরা নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, আমরা নাজ্জার গোত্রের মেয়ে, কী সৌভাগ্য আমাদের, মুহাম্মদ আমাদের প্রতিবেশী। (বায়হাকি, ইবনে কাছির)
প্রথম মদিনা শরিফে গমন
রাসুল (সা.) যখন পাঁচ বছরের শিশু, তখন মমতাময়ী দুধমা হজরত হালিমা সাদিয়া (রা.) আদরের ধনকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর স্নেহময়ী মায়ের হাতে অর্পণ করেন। এর এক বছর পর তাঁর বয়স যখন ছয়, তখন মা আমিনা তাঁর পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের মাতুলালয় দেখানোর জন্য সেখানের লোকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁকে ইয়াসরিব নিয়ে যান। প্রিয়তম স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারতের অদম্য বাসনাও ছিল মা আমিনার মনে। কিন্তু কুদরতের লীলা বোঝা বড় দায়, দীর্ঘ এক মাস অবস্থান শেষে মদিনার মাতুলালয় থেকে প্রত্যাবর্তনকালে পথিমধ্যে আল-আবওয়ায় (জায়গাটি মস্তুরার কাছেই, যা এখন মক্কা-মদিনার মাঝখানে প্রসিদ্ধ মনজিল এবং অর্ধেক রাস্তায়) মা আমিনা পরকালের পথে পাড়ি জমান। এ যেন অদৃশ্য জগৎ থেকে প্রছন্ন ইঙ্গিত যে হে নবী! এই ভূমিতেই পরবর্তী সময়ে আপনাকে হিজরত করতে হবে। এখানেই গড়ে উঠবে আপনার আবাসভূমি। ইসলামের প্রচার, প্রসার এবং বিকাশ ঘটবে এখান থেকেই। মদিনার পরিবেশ এবং আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচিত করতেই যেন এ সফরের মহা আয়োজন। বনু নাজ্জারের প্রতি রাসুল (সা.)-এর আলাদা টান ছিল। রাসুল (সা.) হিজরতের পর বনু নাজ্জারের ঘরবাড়ি দেখে বলেন, আমার মা এখানেই নেমেছিলেন এবং বনি আদী ইবনুন-নাজ্জারের বাওয়ালিতে (সিঁড়িযুক্ত বড় কুয়া) আমি খুব লাফালাফি করেছিলাম। (শরহে মাওয়াহিবুন লাদুন্নিয়া ১/১৬৭)
মদিনা শরিফে হিজরত
মক্কায় ইসলাম প্রচার যখন অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে, মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন সীমা অতিক্রম করে, তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের মদিনায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করা হয়। রাসুল (সা.) আপন প্রিয় সহচর হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে নিয়ে যখন মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন প্রায় ৫০০ আনসারের একটি বিরাট দল এই পবিত্র কাফেলাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। পুরো মদিনা লোকে লোকারণ্য। পথে-ঘাটে, লোক চলাচলের রাস্তায়, ঘরের ছাদে, খিড়কিপথে ও দরজায় এককথায় মদিনার অলিগলিতে উৎফুল্ল মানুষের মহাসমুদ্র। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, মনিব-ভৃত্য সবার মুখেই অনুরণিত হচ্ছিল নিম্নের কবিতাটি, ভাবার্থ, ছানিয়্যাতুল বিদা পাহাড়ের দিক থেকে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় ঘটেছে। যত দিন আল্লাহর নাম নেওয়ার মতো একজনও থাকবে, আমাদের ওপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অত্যাবশ্যকীয় হবে। আমাদের মধ্যে প্রেরিত ওহে সজ্জন! আপনি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের নির্দেশ নিয়ে এসেছেন। হজরত আনাস (রা.) তখন স্বল্পবয়সী বালক ছিলেন। তিনি বলেন, যেদিন রাসুল (সা.) মদিনা শরিফে তাশরিফ আনেন, সেদিনের চেয়ে আলোকোজ্জ্বল এবং অনিন্দ্য সুন্দর দিন আমি আর দেখিনি।
No comments:
Post a Comment