Tuesday, June 30, 2015

ছাদক্বাতুল ফিতরঃপর্ব -১



ছাদক্বাতুল ফিতরঃপর্ব -১
ইমাম মালেকের মতে সুন্নাত, হানাফী মাযহাবের নামে মত প্রকাশ করতে যেয়ে বলা হয়েছে গৃহস্থালীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু মাল থাকলেই ফিতরা ওয়াজিব। শাফেঈর মতে ঈদের দিন খোরাকির অতিরিক্ত কিছু মাল থাকলেই ফিতরা আদায় করা ফরয। ইমাম আহমাদের মতে ওয়াজিব। তিরমিযী ২৩১ বঙ্গানুবাদ পৃষ্ঠায় সোঃ বুক হাউস এর অনুবাদক লিখেছেন ফিতরার পরিমাণ (মাথা পিছু) গম অর্ধ ছা’ (এক সের তের ছটাক) আর অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য পূর্ণ এক ছা’ (তিন সের নয় ছটাক)। আমাদের দেশে চাউল হলো গমের পরিপূরক। সুতরাং চাউল দিয়ে ফিতরা আদায় বৈধ। (কিয়াস করে চাউলের কথা বলা হয়েছে, টাকার কথা বলা হয়নি)। ফতোয়ায়ে আলমগীরী সব খন্ড একত্রে ২০৯ ও ২১০ পৃষ্ঠায় সুরখুশির উদ্বৃতি দিয়ে, হানাফী মাযহাবের নামে মত প্রকাশ করতে যেয়ে বলা হয়েছে কিসমিস এর অর্ধ ছা’ দিলেই ফিতরা আদায় হয়ে যায় কারণ এর সব অংশ খাদ্যের উপযুক্ত। আবার বলা হয়েছে, অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, কিসমিস এক ছা’ দিতে হবে। সাহেবাইনের নিকট এই কওল গ্রহনযোগ্য। ইহা আদায় করতে মূল্যের দিকে হিসাব করতে হবে। একই পৃষ্ঠায় তাহাবী শরীফের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হযেছে, ছাদক্বায়ে ফিতর চার প্রকার জিনিসের মধ্যে দেওয়া ওয়াজিব। যথাঃ যব, গম, খুরমা, কিসমিস। রুটি ছাদক্বায়ের দেওয়া না যায়েজ কিন্তু মূল্য দিয়ে দেওয়া যায়েজ আছে। বাহরুর রায়েকের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে অর্ধ ছা’ যব অথবা অর্ধ ছা’ খুরমা এবং এক শরয়ী মন গম অথবা অর্ধ ছা’ যব এবং এক চতূর্থাংশ গম দেয় তবে আমাদের নিকট যায়েজ হবে। আবার বলা হয়েছে গম দেওয়ার চেয়ে আটা দেওয়া ভালো, আটার চেয়ে নগদ টাকা ভালো। এর যুক্তি এতে আবশ্যক পূরন হয়। অন্য কোন ফসল ফিতরা হিসাবে দেওয়া যায়েজ নেই। তবে মূল্যের দিক হিসাব করে দেওয়া যায়েজ আছে। এগুলো যুক্তি ও মত।
#####‪#‎চলুন‬ মূল দলীল (কোরআন-হাদীসে)কি বলছেঃ
ليعبدون ٳلا والانس الجن خلقت وما
‘আমি জিন ও মানব জাতীকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’। (যারিয়াত আয়াত-৫৬)।
ইবাদত পালনে ত্রুটি বিচ্যুতি হলে আল্লাহ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ারও ব্যবস্থা রেখেছেন। ফরয সালাতের জন্য সুন্নাত ও নফল রাখা হয়েছে। ছিয়াম হল মহান আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে অন্যতম আর ছিয়াম পালনে যে সকল ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে থাকে তার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ছাদক্বাতুল ফিতর আদায়ের বিধান রেখেছেন। এই বিধান আমাদের সুবিধার্থে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা যাবে না। দ্বীন ইসলাম যখন পরিপূর্ণ, তখন অপূর্ণতার সংশয় মনে ঠাই দেওয়া নিতান্তই মূর্খতা। দ্বীনকে অপূর্ণাঙ্গ মনে করার অর্থই হল কোরআন হাদীসের অপূর্ণতা (নাউযুবিল্লাহ)। আমরা অনেকে ক্বিয়াস দ্বারা সহীহ হাদীস বিকৃত করছি এবং মানছি। যেমন ছাদক্বাতুল ফিতর খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে তার সমমূল্য দিয়ে আদায় করা।
#####‪#‎ছাদক্বাতুল‬ ফিতর কার উপর ফরযঃ
ঈদের দিন সকালে যদি কেউ মৃত্যুবরণ করেন, তার জন্য ফিৎরা আদায় করা ফরয নয়। আবার ঈদের দিন সকালে কোন বাচ্চা ভুমিষ্ট হলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ফরয।
(মির’আত ৬/১৮৫ পৃঃ)।
ছাদক্বাতুল ফিতর হল জানের ছাদক্বা, মালের নয়। বিধায় জীবিত সকল মুসলিমের জন্য জানের ছাদক্বা আদায় করা ওয়াজিব। কোন ব্যক্তি ছিয়াম পালনে সক্ষম না হলেও তার জন্য ফিৎরা ফরয।
ছাদক্বাতুল ফিতর মুসলমান নারী পুরুষ, ছোট-বড় সকলের জন্য আদায় করা ফরয। হাদীসে এসেছেঃ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, রাসূল স্বীয় উম্মতের কৃতদাস ও স্বাধীন নারী ও পুরুষ, ছোট ও বড় সকলের উপর মাথাপিছু এক ছা’ পরিমাণ খেজুর বা যব যাকাতুল ফিৎরা হিসাবে ফরয করেছেন। এবং তা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/-১৮১৫)।
এই হাদীস বর্ধিত আকারে বলেছেন, বর্ণনাকারী রাবী বলেন কিন্তু লোকেরা পরে অর্ধ ছা’ গমকে ধরে নিয়েছেন। এ অংশটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা। যা সহীহ হাদীসের অংশ নয়।
#######ছাদক্বাতুল ফিতরের পরিমাণঃ
রাসূল বলেন, “তোমরা ছাদক্বাতুল ফিতর আদায় কর এক ‘ছা’ খাদ্য দ্রব্য দ্বারা”। (সহীহুল জামে হা/২৪২; সিলসিলা সহীহা হা/১১৮২)।
ছাদক্বাতুল ফিতরের পরিমাণঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর যুগের এক ‘ছা’। যার ওজন চার শত আশি গ্রাম মিসকাল গম। ইংরেজী ওজনে দুই কেজি ৪০ গ্রাম গম। যেহেতু এক মিসকাল সমান চার গ্রাম ও এক চুতর্থাংশ হয়। অতএব রাসূলের(ছাঃ) যুগের এ ‘ছা’ জানতে ইচ্ছা করলে তাকে দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম (২.৪০) গম ওজন করে এমন পাত্রে রাখতে হবে, যা মুখ পর্যন্ত ভরে যাবে। অতঃপর তা পরিমাপ করতে হবে।
(সৌদি সর্বোচ্চ ফতওয়া বোর্ডের সাবেক প্রধান,‘ইবনে উসাইমীন’, ছাদক্বাতুল ফিতর, বঙ্গঃ)।
****অর্ধ ছা’ ফিৎরা আদায় করা সুন্নাত বিরোধী কাজ। মু’আবিয়া (রাঃ) এর যুগে মদীনায় গম ছিল না। সিরিয়া হতে গম আমদানী করা হত। তাই উচ্চ মূল্যের বিবেচনায় তিনি অর্ধ ছা’ গম দ্বারা ফিৎরা দিতে বলেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) সহ অন্যান্য সাহাবীগণ মু’আবিয়া (রাঃ)-এর এই ইজতিহাদী সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর নির্দেশ ও প্রথম যুগের আমলের উপরেই কায়েম থাকেন। যারা অর্ধ ছা’ গম দ্বারা ফিৎরা আদায় করেন, তারা মু’আবিয়া (রাঃ) এর রায়ের অনুসরণ করেন মাত্র।
--- আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, কিন্তু আমি ততটা খাদ্যই আজীবন আদায় দিতে থাকব, যতটা পরিমাণ আমি পূর্বে আল্লাহর রাসূল এর যুগে আদায় দিতাম। (বুখারীÑ১৫০৮;মুসলিমÑ৯৮৫, আদাঃ ১৬১৬ নং)।
ত্বাহাবী প্রমূখ হাদীস গ্রন্থের এক বর্ণনায় আছে, আবূ সাঈদ বলেন, ‘আমি ততটা পরিমাণ খাদ্যই আদায় দিতে থাকব, যতটা পরিমাণ আমি আল্লাহর রাসূল এর যুগে আদায় দিতাম; এক ‘ছা’ খেজুর এক ‘ছা’ যব, এক ‘ছা’ কিসমিস অথবা এক ‘ছা’ পনীর’। এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘অথবা অর্ধ ‘ছা’ গম?’ তিনি বললেন, ‘না। এটা হল মুআবিয়ার মূল্য নির্ধারণ; আমি তাগ্রহণ করিনা এবং তার (এ মতের) উপর আমল করি না। (ইগঃ ৩/৩৩৯)।
অতএব প্রত্যেক মুসলিমকে ছাদক্বাতুল ফিতর হিসেবে এক ‘ছা’ খাদ্যদ্রব্য আদায় করতে হবে। আমাদের সমাজে অর্ধ ছা ফিতরা প্রদানের যে প্রচলন হয়েছে তার প্রমাণ সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
একদা আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কে ছাদক্বাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি রাসূল(ছাঃ) এর যামানায় যেমন এক ‘ছা’ খেজুর অথবা এক ‘ছা’ যব অথবা এক ‘ছা’ পনীর হতে ছাদক্বাতুল ফিতর বের করতাম। কখনই এর ব্যতিক্রম বের করব না। তখন বললেন, কোন এক ব্যক্তি যদি অর্ধ ‘ছা’ গম দ্বারা হয়? তিনি বললেন, না; এটা মুয়াবিয়া কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য। আমি তা মানব না এবং তার উপর আমলও করব না।(সহীহ ইবনে খুযায়ামা হা/২৪১৯; মুস্তাদরাক হাকেম হা/১৪৯৫, সনদ হাসান)।
বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, অর্থাৎ উল্লেখিত হাদীসে নাছ বা দলীলের উপস্থিতিতে ইস্তিহাদ বর্জন করার মাধ্যমে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) এর হাদীস ধারনের দৃঢ়তা ও পূর্ণ ইত্তিবা প্রমাণিত হয়। মুয়াবিয়া (রাঃ) এর ইজতিহাদ এবং মানুষের তা গ্রহন করার মাধ্যমে ইজতিহাদ হওয়া যায়েজ প্রমাণ করে যা প্রশংসনীয়। কিন্তু যেখানে দলীল উপস্থিত সেখানে ইজতিহাদ অগ্রহনীয়। (ফাতহুল বারী ৩/৩৭৪ পৃষ্ঠা; ১৫০৮ নং হাদীসের ব্যাখ্যা)।
মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম মহি উদ্দিন নববী বলেন, যারা অর্ধ ‘ছা’ গমের কথা বলেন তাদের মুয়াবিয়া (রাঃ) এর এই হাদীস ব্যতীত কোন দলীল নেই। (শারহু মুসলিম ৩/৪৪৭ পৃষ্ঠা, ৩৮৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যা)।
উল্লেখ করার মত বিষয় যে, রাসূল(ছাঃ) এর হাদীসে যেসব খাদ্যদ্রব্যের নাম এসেছে তার সবগুলোর মূল্য এক ছিল না। বরং মূল্যে পার্থক্য ছিল। তা সত্ত্বেও সকল খাদ্য দ্রব্য থেকে এক ‘ছা’ করে ছাদক্বাতুল ফিতরা আদায় করতে বলা হয়েছে। অতএব এটা স্পষ্ট যে, রাসূল এর খাদ্যর মূলের প্রতি দৃকপাত না করে তার পরিমাণ বা ওজনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, কোরআন সহীহ হাদীসের বিপরীতে স্বয়ং রাষ্ট্রীয় আমিরের হুকুমকে সাহাবায়ে কেরামগণ অগ্রাহ্য করেছেন শুধুমাত্র হাদীসের সার্বভৌম অধিকারকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। তাই আমাদেরও উচিত পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীসের সার্বভৌমকে নিশ্চিত করতে মাথাপিছু এক ‘ছা’ ফিতরা আদায় করা।
ইমাম নবভী (রহঃ) বলেন, সুতরাং অর্ধ ছা’ ফিৎরা আদায় করা সুন্নাহর খেলাপ। রাসূল(ছাঃ) যাকাতের ও ফিৎরার যে হার নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা রদবদল করার অধিকার কারো নেই। (ফাৎহুল বারী ৩/৪৩৮ পৃঃ)।
এ ব্যাপারে ওমর (রাঃ) একটি ফরমান লিখে আমর ইবনে হাযম (রাঃ) এর নিকট পাঠান যে, যাকাতের নিছাব ও প্রত্যেক নিছাবে যাকাতের যে, হার তা চিরদিনের জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এতে কোন যুগে, কোন দেশে কমবেশি অথবা রদবদল করার অধিকার কারো নেই। (তাফসীর মা’আরেফুল কোরআন পৃঃ৫৭৫)।
বলা বাহুল্য ফিতরার নির্ধারণ করা সঠিক হবে না এবং প্রত্যেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কোন সময় এমন হতে পারে যে, (খেজুরের পরিমানে) ফিতরায় কয়েক ‘ছা’ গম আদায় দিতে হবে।
মোট কথা ‘ছা’ এর পরিমাপকেই ফিতরার মাপকাঠি গণ্য করা হল মৌলিক ব্যাপার। এবং তাতেই রয়েছে সর্ব প্রকার খাদ্য এবং সর্ব যুগের জন্য পূর্ব সতর্কতামূলক আমল। আর এই মত অনুসরণ করার মাধ্যমেই এ ব্যাপারে মতভেদকে এড়ানো সম্ভব হবে এবং মান্য করা হবে সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হাদীসকে। (ফিযাঃ ২/৯৪০-৪১ মুমঃ শারহুল মুমতে ৬/১৭৯-৮০)।
তাছাড়া প্রতি বছর ফিতরা নির্ধারণের প্রয়োজন নেই। এবং মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের ফিতরা নির্ধারণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও থাকবে না।

No comments:

Post a Comment