Tuesday, June 30, 2015

টাকা‬-পয়সা দিয়ে ছাদক্বাতুল ফিতর আদায়ঃ





টাকা‬-পয়সা দিয়ে ছাদক্বাতুল ফিতর আদায়ঃ
টাকা-পয়সা হিসাবে (রুপার) দিরহাম এবং (সোনার) দীনার মুদ্রা আল্লাহর রাসূল(ছাঃ) এর যামানায় মজুদ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ফিতরার যাকাতে এক ‘ছা’ খাদ্য দান করতেই আদেশ করলেন এবং তার মূল্য দান করার এখতিয়ার ঘোষণা করলেন না। সুতরাং ফিতরার খাদ্যের দাম আদায় দেওয়া সাহাবা (রাঃ) গণের বিরুদ্ধাচারণ। যেহেতু তাঁরা ফিতরার সদকায় এক ‘ছা’ খাদ্যই দান করতেন। পরন্ত আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “তোমরা আমার সুন্নাহ (তরীকা) ও আমার পরবর্তী সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাহ অবলম্বন কর। তা খুব সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর। আর অভিনব কর্মাবলী থেকে সাবধান থেকো।---”(আঃ ৪/১২৬,১২৭,আদাঃ ৪৬০৭, তিঃ ২৬৭৬, ইমাঃ ৪৩,৪৪, ইহি,হাঃ ১/৯৫ প্রমুখ, ইগঃ২৪৫৫ নং)।
তাছাড়া ফিতরার যাকাত নির্দিষ্ট দ্রব্য থেকে আদায়যোগ্য একটি ফরয ইবাদত। অতএব নির্দিষ্ট ঐ সব দ্রব্য ছাড়া অন্য দ্রব্য আদায়ের মাধ্যমে ঐ ফরয পালন হবে না। যেমন, তার নির্দিষ্ট সময় ছাড়া অন্য সময়ে তার আদায় যথেষ্ট হবে না। পক্ষান্তরে ফিতরার খাদ্য দান করা ইসলামের একটি স্পষ্ট প্রতীক। কিন্তু মূল্য আদায় দিলে তা গোপন দানে পরিণত হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, সুন্নাহর অনুসরণ করাই আমাদের জন্য উত্তম এবং তাতেই আছে সার্বিক মঙ্গল। (মাশারাঃ মজলিস নং ২৮, ফুসিতাযাঃ ৩০ পৃঃ)।
বুঝা গেল যে, গ্রাম-শহর সকল স্থানে প্রধান খাদ্য চাল ফিতরা দেওয়ার পরিবর্তে তার নির্দিষ্ট মূল্য আদায় করা যথেষ্ট নয়।
টাকা দেওয়া যাবে যেক্ষেত্রেঃ চাকুরী-জীবী হলেও তাকে চাল (খাদ্য) ক্রয় করে ফিতরা দিতে হবে। অবশ্য তার কোন এমন প্রতিনিধি অথবা কোন এমন সংস্থাকে টাকা দেওয়া চলবে, যে খাদ্য ক্রয় করে ঈদের আগে গরীবদের হাতে পৌছে দেবে।
(হামিদ আল মাদানী, রঃ ফাঃ ও রোঃ মাঃ পৃষ্ঠা-১২৮)।
এখানে খাদ্য বলে মৌলিক উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে অর্থাৎ ফিতরা ছিল মানুষের খাদ্য ও আহার; যা খেয়ে লোকেরা জীবন ধারণ করত। এ কথার সমর্থন করে ইনে আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) রোযাদারের অসাড়তা ও যৌনচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা এবং মিসকিনদের আহার স্বরূপ (ছাদক্বাতুল ফিতর) ফরয করেছেন ---।(সআদাঃ ১৪২০, ইমাঃ ১৮২৭, দারাঃ হাঃ১/৪০৯, বাঃ ৪/১৬৩)।
সুতরাং যেদেশের প্রধান খাদ্য কোন শস্য অথবা ফল না হয়; বরং গোশত হয় যেমন, যারা পৃথিবীর উত্তর মেরুতে বসবাস করে তাদের প্রধান খাদ্য হল গোশত। তারা যদি ফিতরায় গোশত দান করে, তাহলে সঠিক মত এই যে, নিঃসন্দেহে তা যথেষ্ট হবে। সারকথাঃ দেশের প্রধান খাদ্য শস্য ফল বা গোশত যাই হোক না কেন ফিতরায় তা দান করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। তাতে সে খাদ্যের কথা হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ থাক অথবা না থাক।(মুমঃ ৬/১৮০-১৮৩)।
তাছাড়া খাদ্যমূল্য প্রদান করা সাহাবাদের পরিপন্থী কারণ,তারা খাদ্য জাতীয় বস্তু দ্বারাই ছাদক্বাতুল ফিতর আদায় করতেন।
রাসূল (ছাঃ)বলেছেন, তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরবর্তীতে সঠিক পথে পরিচালিত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আকড়ে ধর। ছাদক্বাতুল ফিতর নির্দিষ্ট একটি এবাদত,তাই অনির্দিষ্ট বস্তু দ্বারা আদায় করলে তা গ্রহনযোগ্যতা পাবে না। যেমন নির্দিষ্ট সময় ছাড়া আদায় করলে আদায় হয় না।
*****আবারো উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাদক্বাতুল ফিতর বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যদ্রব্য দ্বারা নির্ধারণ করেছেন। আর প্রত্যেক খাদ্য দ্রব্যের মূল্য সমান নয়। সুতরাং মূল্যই যদি ধর্তব্য হয়, তাহলে নির্দিষ্ট কোন এক প্রকারের এক ‘ছা’ হতো এবং তার বিপরীত বস্তু দ্বারা ভিন্ন মূল্যের হতো। দ্বিতীয়ত মূল্য প্রদানের দ্বারা ছাদক্বাতুল ফিতর প্রকাশ্য ইবাদতের রূপ হারিয়ে গোপন ইবাদতের রূপ পরিগ্রহন করে, তাই এটা পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। এক ‘ছা’ খাদ্য সবার দৃষ্টি গোচর হয়, কিন্তু মূল্য সবার দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয় না।
(সৌদি সর্বোচ্চ ফতওয়া বোর্ডের সাবেক প্রধান, ‘উসাইমীন’, সাদকাতুল ফিতর, বঙ্গঃ পৃষ্ঠা নং-৮)।
খাদ্যশস্য ব্যতীত অর্থ কিংবা দীনার-দিরহাম দিয়ে ফিৎরা আদায় করেছেন মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) , সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের কোন আমল পাওয়া যায় না। খাদ্যশস্যের স্বপক্ষেই হাদীসে এসেছে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমরা খাদ্যশস্য (طعام) যব, খেজুর, পনীর, কিশমিশ দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করতাম।(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৮১৬)।
طعام শব্দটির অর্থ হল খাদ্য। পরিভাষায় যা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা যায়, তাই طعام। طعام দ্বারা টাকা পয়সা বুঝায় না। তাছাড়াও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর পূর্ব যুগ হতেই মক্কা-মদীনায় দিরহাম-দিনার প্রভৃতি মুদ্রার প্রচলন ছিল। কিন্তু তিনি এক ছা’ খাদ্যশস্যের মূল্য হিসাবে দিরহাম প্রদানের নির্দেশ দেননি। বরং খাদ্যশস্য দিয়ে ছাদক্বাতুল ফিতর আদায় ওয়াজিব করেছেন।
খাদ্যশস্যের মূল্য দিয়ে ফিৎরা আদায় করা, ছাদক্বা ক্রয় করার নামান্তর। যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, ওমর (রাঃ) তাঁর একটি ঘোড়া এক ব্যক্তিকে সওয়ার হওয়ার জন্য আল্লাহর রাস্তায় ছাদক্বা করে দিলেন, যে ঘোড়াটি রাসূল (ছাঃ) তাকে দান করেছিলেন। তারপর ওমর (রাঃ) খবর পেলেন, লোকটি ঘোড়াটি বাজারে বিক্রি করছে। এ খবর শুনে ওমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি ঘোড়াটি ক্রয় করতে পারি? রাসূল (ছাঃ) জবাবে বললেন, তা ক্রয় কর না এবং তোমার ছাদক্বা ফেরত নিও না। আলোচ্য হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, যে কোন প্রকারের ছাদক্বা ক্রয় করা হারাম। যদি ক্রয় করা হালাল হত তবে রাসূলুল্লাহ ওমর (রাঃ) কে ক্রয় করার অনুমতি দিতেন এবং ফিৎরা খাদ্যশস্যের পরিবর্তে দিরহাম-দিনারও প্রদানের অনুমতি দিতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। চার খলীফা, সাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ কেউই অনুরূপভাবে ছাদক্বা ক্রয় করার পক্ষে ছিলেন না।
*****এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, ফিতরা হল ফরয এবং কুরবানী হল সুন্নাত। ফরযকে যদি পরিবর্তন অথবা পরিমার্জন করা জায়েয হয়, তাহলে কুরবানীর পরিবর্তে তার মূল্য প্রদানে বাধা কোথায়? নিয়ত তো বেশ সহীহ। যেহেতু কুরবানীর সমমূল্য জায়েয নয়। তেমনি ফিতরার সমমূল্য প্রদান করা যায়েজ হয় কিভাবে?
এ সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন, ‘যদি কেউ কুরবানীর বদলে তার মূল্য ছাদক্বা করতে চান, তবে তিনি মুহাম্মাদী শরী’আতের প্রকাশ্য বিরোধীতা করবেন’। (মাজমু’আ ফতোয়া ২৬/৩০৪; মূগনী ১১/৯৪-৯৫ পৃঃ)।
এক ‘মুদ্দ’ এক ছা’ এর চুতূর্থাংশ অর্থাৎ আমাদের সোয়া চৌদ্দ ছটাকের সমান। আল হেদায়ায় অর্ধ ছা’ গমের পক্ষে যে দলীল পেশ করেছেন তা হলঃ আব্দুল্লাহ ইবনে ছ’লাবা অথবা ছা’লাবা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু ছু’আইর ----এক ছা’ প্রত্যেক দুই ব্যক্তির মধ্যে --- বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ হয়েছে আবু দাউদ হা/১৬১৯; মিশকাত হা/১৮১৯ এ।
হাদীস বিশারদগণ বর্ণনাটিকে সর্ব সম্মতিক্রমে যঈফ, যা আমলের অযোগ্য বলেছেন।(দেখুন যঈফ আবু দাউদ হা/১৬১৯)।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে আবু দাউদ ১৬২২, মিশকাত ১৮৭১ এ আধা ছা’ গম ফরয করেছেন মর্মে বর্ণনাটি যঈফ। উক্ত বর্ণনার সনদে নুমান ইবনু রাশেদ নামের রাবী যঈফ। অতএব তা আমল যোগ্য নয়।
আমর ইবনে শুআইব তার পিতার সুত্রে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম ---দুই ‘মুদ্দ’ গম বা তা ছাড়া অন্য কিছু বা এক ছা’ খাদ্য মর্মে বর্ণিত হাদীসটিও যঈফ। (যঈফ তিরমিযী হা/৬৭৪; মিশকাত হা/১৮১৯)।
ছাদক্বাতুল‬ ফিতরের উপকারিতা ঃ
১. দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা হয়।
২. ঈদের দিনগুলোতে দরিদ্র ব্যক্তিরা ধনীদের ন্যায় স্বচ্ছলতা বোধ করে।
৩. ছাদক্বাতুল ফিতরের ফলে ধনী-গরীব সবার জন্য ঈদ আনন্দদায়ক হয়।
৪. ছাদক্বাতুল ফিতর আদায়কারী দানশীল হিসেবে পরিগণিত হয়।
৫. ছাদক্বাতুল ফিতরের মাধ্যমে সিয়াম অবস্থায় ঘটে যাওয়া ত্র“টিগুলোর কাফ্ফারা করা হয়।
৬. ছাদক্বাতুল ফিতর দ্বারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হয়। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে বান্দাকে পূর্ণ এক মাস সিয়াম পালনের তওফিক দিয়েছেন, সাথে সাথে ছাদক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য।

No comments:

Post a Comment